খালেদা জিয়ার সশ্রম কারাদণ্ড: বিধান কী বলে?

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। তার বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা দণ্ডবিধির ৪০৯ ও ১০৯ ধারার অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করে ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ মো. আখতারুজ্জামান দুপুর ২টা ২৯ মিনিটে এ রায় দেন। মামলার সারসংক্ষেপ পড়ে বিচারক বলেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে সক্ষম হওয়ায় তাকে দণ্ডবিধি ৪০৯ ১০৯ ধারা অনুযায়ী ৫ বছরে সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো।’ যদিও খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ রায়ের পরপর সাংবাদিকদের বলেন, ‘তারেক রহমানসহ মামলার অন্য আসামিদের সশ্রম কারাদণ্ড হলেও খালেদা জিয়ার বিনাশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে।’

আইনজীবীরা বলছেন, সশ্রম কারাদণ্ডের ক্ষেত্রে কারাগারের নিজস্ব নিয়ম অনুযায়ী শ্রম নির্ধারিত হয়। নিয়ম অনুযায়ী সশ্রম কারাদণ্ডাদেশপ্রাপ্তদের পুনর্বাসনের চিন্তা থেকেই আইনে কারাদণ্ডের সঙ্গে এই শ্রম বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছিল, যেন আসামি কারাভোগ শেষে তার মধ্যে আর কোনও অপরাধ প্রবণতা না থাকে।

দশ বছর আগে জরুরি অবস্থার মধ্যে দুদকের দায়ের করা এ মামলার ছয় আসামির মধ্যে খালেদা জিয়ার বড় ছেলে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মাগুরার সাবেক সাংসদ কাজী সালিমুল হক কামাল, সাবেক মুখ্য সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান ও ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদকে দশ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছেন আদালত।

সশ্রম না বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলেন খালেদা জিয়া, এমন প্রশ্নের জবাবে আইনজীবী সানাউল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বাকি ৫ আসামি সশ্রম কারাদণ্ড ও চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিনাশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে।’ এদিকে, আদালতে অবস্থানরত একাধিক সংবাদকর্মী বলছেন, খালেদা জিয়ারও সশ্রম কারাদণ্ডের রায় ঘোষণা করেই বিচারক এজলাস ছেড়েছেন। সেক্ষেত্রে আপনি নিশ্চিত কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে সানাউল্লাহ বলেন, ‘তা বলতে পারবো না। আমরা এখনও রায়ের কপি পাইনি।’

সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান বিষয়ে বলতে গিয়ে ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কয়েদিদের ভবিষ্যৎ পুনর্বাসনের কথা ভেবে জেলকোড অনুযায়ী কাজ দেওয়া হয়। আত্মউন্নয়নের কাজে লাগবে এ ধরনের কাজ তার সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়। এজন্য খুব ভারী কাজ করতে হয়, এমনটা নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘কারাগার থেকে বেরিয়ে একজন বন্দি যেন নতুন করে অপরাধ জগৎ নিয়ে না ভেবে উৎপাদনমূলক কাজে নিজেকে যুক্ত করতে পারে, সেটা ভেবেই এই সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।’

কারা আইন ১৮৯৪-এর সিভিল বন্দিদের কাজে নিযুক্ত অংশে বলা আছে, ‘‘(১) সিভিল বন্দিরা সুপারিনটেন্ডেন্টে অনুমোদনক্রমে কোনও কাজ বা কোনও ব্যবসা বা কোনও পেশায় নিয়োজিত হতে পারিবেন। (২) সিভিল বন্দিরা নিজস্ব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করিলে এবং কারাগারের ব্যয় হইতে তাহাদের ভরণ পোষণ করা না হইলে তাহাদের সম্পুর্ণ আয় তাহারা গ্রহণ করিতে পারিবেন। কিন্তু কারাগারের যন্ত্রপাতি বা কারাগারের ভণপোষণ ব্যয় হইয়া থাকিলে, সুপারিনটেনডেন্ট কর্তৃক যন্ত্রপাতি বা ভরণপোষণ ব্যয় তাহাদের আয় হইতে কর্তন করা হইবে।’’

এছাড়া ফৌজদারি বন্দিদের কাজে নিযুক্তির বিষয়ে বলতে গিয়ে বলা হয়, ‘‘(১) সশ্রম দণ্ডে দণ্ডিত  কিংবা নিজের ইচ্ছায় শ্রমে নিয়োজিত কোনও ফৌজদারি বন্দিকে সুপারিনটেন্ডেন্টের লিখিত অনুমতিক্রমে জরুরি প্রয়োজন ব্যতিত, দৈনিক নয় ঘণ্টার বেশি কাজে নিয়োজিত রাখা যাইবে না; (২) মেডিক্যাল অফিসার শ্রমে নিয়োজিত বন্দিদের সময়ে সময়ে পরীক্ষা করিবেন। কমপক্ষ প্রতি পাক্ষিকে একবার শ্রমে নিয়োজিত প্রত্যেক বন্দির ওজন হিস্ট্রি টিকেটে রেকর্ডের ব্যবস্থা করিবেন; (৩) যখন মেডিক্যাল অফিসার অভিমত প্রদান করেন যে, শ্রমে নিয়োজিত কোনও বন্দি কোনও প্রকার বা শ্রেণির শ্রমের কারণ পীড়িত হইতেছেন, তখন সে বন্দিকে ওই শ্রমে নিয়োজিত রাখা যাইবে না। তবে মেডিক্যাল অফিসারের বিবেচনা মতে অন্য কোনও প্রকার সুবিধাজনক শ্রমে তাকে নিয়োজিত করা যাইবে।’’

ধারা ৩৬-এ বিনাশ্রম ফৌজদারি বন্দিদের কাজে নিযুক্তি অংশে বলা হয়েছে, ‘‘সকল বিনাশ্রম ফৌজদারি বন্দিদের কাজে নিয়োজিত (যতক্ষণ পর্যন্ত তাহারা আগ্রহ প্রকাশ করে) করিবার জন্য সুপারিনটেন্ডেন্ট কর্তৃক নিয়ম করা যাইবে কিন্তু সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত না হইলে কোনও বন্দিকে কাজে অবহেলা করিবার জন্য ডায়েট স্কেল পরিবর্তন, যাহা অনুরূপ কোনও বন্দির কাজে অবহেলার জন্য কারাগারের নিয়ম হিসেবে চালু করা যাইতে পারে, ইহা ব্যতিত অন্য কোনও শাস্তি দেওয়া যাইবে না।’’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error

নিউজ টি শেয়ার করুন :)

Instagram
LinkedIn
Share
Follow by Email