রূপেগুনে সমৃদ্ধ সোনালু – আসমা অন্বেষা

চারদিক যখন জ্বলছে প্রখর তাপে এবং খরায় তখন নিতান্ত রসিকের মত অবিরাম ক্লান্তিহীন ফুল ফুটিয়ে যাচ্ছে এই সোনালু। সোনার বরণে সেজে থাকে বলেই সম্ভবত সোনালু নাম এই ফুলের। হলুদের যেন উৎসব চলেছে ধরাতে। দেশীয় ফুলের মধ্যে একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে সোনালু। গ্রীষ্মের খরতাপ এবং শুষ্কতার মধ্যে এরা হলুদের রঙ ছড়িয়ে দেয় এবং থরে থরে ঝুলে থাকে গাছের ডালে।

বাংলাদেশ এবং ইন্ডিয়াতে কয়েকটি সুন্দর ফুলের মধ্যে একটি সোনালু। ইন্ডিয়াতে বলা হয় আমালতাস (Amaltas) এবং বাংলাদেশে বানরলাঠি নামে ব্যাপকভাবে পরিচিত। প্রতিটি ফুলের ছড়া ৩০ সেমি লম্বা বোঁটার সাথে অজস্র সুমিষ্ট ঘ্রাণ আর গোলাকার কুঁড়ি সহ ঝুলে থাকে। এই সুশ্রী ফুলেরা আকর্ষণ করে মৌমাছি, প্রজাপতি এবং ছোট ছোট পাখিদের।

মৌমাছির অনেকগুলো প্রজাতি এবং প্রজাপতি সোনালু ফুলের পরাগায়নের কাজ করে থাকে। এটা খুবই জনপ্রিয় অরনামেন্টাল গাছ এবং হারবাল মেডিসিন হিসেবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন ফুল হওয়ার কারণে এবং ব্যাপকভাবে ব্যবহারের কারণে এই ফুলের অনেকগুলো সাধারণ নাম তৈরি হয়েছে। সোনালুকে golden shower, golden rain tree, purging cassia, golden shower cassia ইত্যাদি নামে ডাকা হয়।

স্প্যানিশ ভাষা ব্যবহারকারী দেশগুলোতে একে ডাকা হয় Caña fistula বলে। অন্যান্য আরও অনেক নামে ডাকা হয় এদের। সোনালুর বৈজ্ঞানিক নাম Cassia fistula এবং এই গাছ Fabaceae পরিবারের সদস্য। আদিবাস ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট এবং তার সাথে সাউথইষ্ট এশিয়ার সংযুক্ত এলাকা। এদের বাসস্থান রেঞ্জ পাকিস্তান থেকে শুরু করে পূর্ব ইন্ডিয়া, মিয়ানমার, থাইলান্ড এবং শ্রীলঙ্কা।

গোল্ডেন শাওয়ার প্রখর সূর্যালোকে খুব ভালভাবে বেড়ে উঠতে পারে এবং ফুল ফোটাতে পারে। এটি একটি মাঝারি আকারের গাছ। এই গাছ ১০ থেকে ১৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এরা খুব তারাতারি বেড়ে উঠতে পারে। সারা বছর সোনালুর গাছে পাতা থাকেনা। পাতা ১৫-৬০ সেমি লম্বা হতে পারে এবং প্রতিটি পাতাতে আট জোড়া লিফলেট থাকে। শাখা প্রশাখাদের মধ্যে কিছুটা ফাঁকা ফাঁকা থাকে।

ডালগুলো ঢেকে থাকে সহজ যৌগ পাতা দিয়ে। ফুল সাধারনত পেন্ডুলাস রেসিমস্‌ (racemes)। প্রতিটি ফুলের ব্যাস ৪-৭ সেমি। গ্রীষ্মে এই গাছে থোকায় থোকায় হলুদ রঙের সুশ্রী ফুলে ফুলে ভরে যায়। ফুলের থোকাগুলো আঙ্গুরের মত নিচের দিকে ঝুলে থাকে। ফলগুলো সাধারণত লেগুম। ৩০-৬০ সেমি লম্বা হয়। ফলে তীব্র গন্ধ থাকে। অনেকগুলো শক্ত বীজ থাকে একটি ফলে।

সোনালু গাছের কাঠ সাধারণত মজবুত হয়। এই কাঠ শ্রীলঙ্কার “আহালা কানুয়া” (Ahala Kanuwa) তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। এটি শ্রীলঙ্কার এডামস পিক (Adams Peak) এর একটি অংশ। এডামস পিককে সিনহালিজ ভাষায় শ্রী-পাদা বলা হয়। ২,২৪৩ মিটার উচ্চতা সম্পন্ন লম্বা কনিক্যাল মাউনটেইন যা শ্রীলঙ্কাতে অবস্থিত। এই জায়গাটি পবিত্র একটি পায়ের ছাপ (sacred footprint) এর জন্য বিখ্যাত।

পাহাড়ের শীর্ষে ১.৮ মিটার রকের উপর এই ছাপটি আছে। বৌদ্ধ ধর্মের বিশ্বাসীরা ভাবেন এটি গৌতম বুদ্ধের পায়ের ছাপ। হিন্দুরা ভাবেন এটি শীবের পায়ের ছাপ, ক্রিশ্চিয়ানরা ভাবেন সেন্ট থমাস এর এবং মুসলিমরা ভাবেন এটি আদম (আঃ) এর পায়ের ছাপ। সোনালু ট্রপিক্যাল এবং সাব-ট্রপিক্যাল এলাকাতে খুব ভালোভাবে বেড়ে ওঠে।

বসন্তের শেষে ফুল ফোটা শুরু হয় এবং গ্রীষ্ম কাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়। গাছগুলোতে প্রচুর হলুদ ফুল ফোটে একসাথে। অনেক সময় গাছে কোন পাতা থাকেনা। পুরো গাছ জুড়ে কেবল ফুল আর ফুল। শুষ্ক মৌসুমে ফুলে ফুলে ছেয়ে থাকে গাছগুলো।

গ্রীষ্মের প্রখর তাপে সোনালী চাদর পড়িয়ে রাখে প্রকৃতিতে। পূর্ণ সূর্যালোকে এবং ভালো ড্রেইনিং সিস্টেম থাকলে এদের ফুল এবং গাছের গ্রোথ ভালো হয়। এই গাছগুলোর মধ্যে খরা এবং লবন সহিষ্ণু গুনাবলী রয়েছে।

এরা অল্প ঠান্ডা সহ্য করতে পারে কিন্তু ঠান্ডা দীর্ঘস্থায়ী হলে গাছের ক্ষতি হয়। যে সমস্ত এলাকাতে গ্রীস্ম এবং শীতের তাপমাত্রার সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে সেই সমস্ত এলাকাতে এরা ভালোভাবে বেড়ে ওঠে। আয়ুর্বেদিক শাস্ত্রে সোনালুকে বলা হয় aragvadha বা “disease killer”। সোনালু ফলের পালপ্‌কে কৌষ্ঠ-পরিষ্কারক বা রেচক বলে বিবেচনা করা হয়।

যদিও হাজার হাজার বছর ধরে ঔষধিতে সোনালু ব্যবহৃত হয়ে আসছে, এই গাছের ঔষধি গুনাগুন নিয়ে খুব কমই গবেষণা হয়েছে। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় ফলের ভিতরকার নরম অংশ মাইল্ড ল্যাক্সসেটিভ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

জ্বর কমানোর জন্য, আরথ্রাইটিস এবং নার্ভ এর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয় সোনালু। সব রকমের রক্ত-পিত্ত (haemorrhages), হার্টের সমস্যা এবং স্টমাকের সমস্যা, acid reflux ইত্যাদির বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয় সোনালুর ওষুধ।

এদের শিকড়কে মনে করা হয় স্ট্রং পারগেটিভ বা রেচক। সোনালুর ফল সিলিন্ড্রিক্যাল, গাড় বাদামী রঙের এবং প্রায় ২ ফুটের মত লম্বা হয় যাতে ৪০-১০০টি শক্ত বাদামী রঙের ফল থাকে।

ফলগুলো বেশ শক্ত এবং শুকিয়ে যাবার পর সোনালুর ফল সিলিন্ড্রিক্যাল, গাড় বাদামী রঙের এবং প্রায় ২ ফুটের মত লম্বা হয় যাতে ৪০-১০০টি শক্ত বাদামী রঙের ফল থাকে। ফলগুলো বেশ শক্ত এবং শুকিয়ে যাবার পর ফলের ভিতর থেকে বীজ চারদিকে ছড়িয়ে পড়া বা বিচ্ছুরণ হবার সম্ভাবনা খুবই কম দেখা যায়।

প্রশ্ন হলো কিভাবে প্রকৃতিতে এদের বীজের বিচ্ছুরণ ঘটে। প্রশ্নটি দেখা দিল Robert Scott Troup এর মনে। কিভাবে সোনালুর বীজের বিস্তার লাভ করে তা জানার জন্যে একটি পরীক্ষা করেন তিনি।

পরীক্ষা শেষে তিনি জানতে পারেন যে, বেশ একটা মজার ব্যাপার জড়িত আছে এদের ফলের বিচ্ছুরণের সাথে। পরিপক্ক ফলগুলোর মধ্যে, বীজগুলো মিষ্টি পালপ্‌ দিয়ে আবৃত থাকে যার ভিতরে রেচক (laxative) জাতীয় পদার্থ থাকে।

জঙ্গলে, এই ফলগুলো অলস ভালুক এবং শেয়ালদের (golden jackals) প্রিয় খাবার। তারা বীজসহ এই ফল খায় এবং পাকস্থলীর ভিতর দিয়ে অক্ষত বীজ খাদ্যনালী পার হয়ে মাটিতে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।

এই কারণেই এদের অঙ্কুরোদগম তারাতারি হয়। বাস্তবে আমরা যদি এদের বীজ থেকে চারা বানাতে চাই তাহলে বীজকে ৫ মিনিট ফুটন্ত পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে এবং তারপরে ২৪ ঘন্টা ঠান্ডা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে ভালোভাবে অঙ্কুরোদগমের জন্য।
সোনালু গাছ মৌমাছি পালন (Apiculture) এর জন্য খুবই উপযোগী।

এই গাছকে বাতাসের প্রতিবন্ধক হিসেবে বা শেড-ট্রি হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। এই গাছ থেকে খুবই উন্নত মানের চারকোল এবং ট্যানিন পাওয়া যায়। সোনালুর পাতা থেকে খুব ভালো জাতের সার তৈরি হয়।

সোনালুর অপরূপ ফুলেরা বাগানের এবং রাস্তাঘাটের শোভা বর্ধন করে এদের নান্দনিক রূপ দিয়ে। রাস্তার দুপাশে যখন সোনালু গাছ লাগানো হয় এবং ফুল ফোটে তখন অভূতপূর্ব দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। সোনালু বা আমালতাস কেরালার রাষ্ট্রীয় ফুল। কেরালার ভিসু (Vishu) ফেস্টিভ্যালে সোনালু ফুল ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে অনেক গুরুত্ব বহন করে।

২০ টাকার স্ট্যাম্পের উপর এই গাছের ছাপ আছে। সোনালু থাইল্যান্ডের জাতীয় গাছ এবং জাতীয় ফুল। এদের হলুদ ফুল বহন করে থাই রাজকীয় মর্যাদা। লাওসে সোনালুর ফোটা ফুলকে স্থানীয়ভাবে বলা হয় ডক খঊন (dok khoun) যা লাওসের নতুন বছরের উৎসবের সাথে জড়িত। লাওসের মানুষ এই ফুল দিয়ে মন্দিরে অর্ঘ দেয় এবং ঘরের মধ্যে ঝুলিয়ে রাখে।

সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে, নতুন বছরে এই ফুল তাদের পরিবারের জন্য বয়ে নিয়ে আসবে শান্তি, সৌভাগ্য এবং আনন্দ।

সোনালু বা বানরলাঠির জানা অজানা তথ্য ও ভেষজ গুণাবলী জানতে হলেঃ http://www.pepeelika.com/health/article.php?ContentID=CONT-02372

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error

নিউজ টি শেয়ার করুন :)

Instagram
LinkedIn
Share
Follow by Email