শ্রীমৎ আনন্দপ্রিয় ভিক্ষু, ছতর পিটুয়া আর্য্য শ্রাবক সঙ্ঘ অরণ্যারাম বিপাসসানা মেডিটেশন সেন্টার

মনের কর্মকাণ্ড গুলো হচ্ছে প্রাণঘাতী বিষাক্ত সাপের মতো

শ্রীমৎ আনন্দপ্রিয় ভিক্ষু, ছতর পিটুয়া আর্য্য শ্রাবক সঙ্ঘ অরণ্যারাম বিপাসসানা মেডিটেশন সেন্টার

সাক্ষাৎকার গ্রহনঃ রাজু চৌধুরী

ভদন্ত আনন্দপ্রিয় ভিক্ষু একান্ত আলাপচারিতায় ধর্মীয় জ্ঞানে কিছু কথা তুলে ধরেন। গৃহী নাম ছিল অতীশ বড়ুয়া, পিতা –স্বর্গীয় ইঞ্জিনিয়ার সমরেন্দ্র চৌধুরী বড়ুয়া , মাতা – নন্দিতা বড়ুয়া। গ্রামের বাড়ী ছিল পটিয়া উপজেলার  পিঙ্গলা গ্রামে এবং মামার বাড়ী কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এর প্রথম অধ্যাপক (স্বামী ) পুণ্যান্ন্দ মহাথের এর জন্মস্থান পটিয়া উপজেলার ছতর পিটুয়া গ্রামে একই বাড়িতে।
গৃহী অবস্থায় ছাত্রজীবনে তিনি ঢাকা নটরডেম কলেজ হতে ১৯৯৪ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরে ভারতের আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০০ সালে অনার্স এবং মাস্টার্স ডিগ্রী লাভ করেন, তিনি পারিবারিকভাবে একটি সুশিক্ষিত পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। তাঁর বড় ভাই প্রকৌশলী বিপ্লব বড়ুয়া কাপ্তাই ইঞ্জিনিয়ারিং একাডেমিতে এবং ছোট ভাই অনিন্দ্য বড়ুয়া ইমন আই,টি ইঞ্জিনিয়ার আরব আমিরাতে কর্মরত। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. কুন্তল বড়ুয়া এবং বিশিষ্ট চক্ষু চিকিৎসক ডাক্তার উৎপল বড়ুয়া তার জেঠাত ভাই। পটিয়া উপজেলার ছতর পিটুয়া গ্রামে বর্তমানে তিনি বুদ্ধ প্রদর্শিত পথে প্রব্বজিত হয়ে ভিক্ষু জীবন গ্রহন করে মুক্তির পথ নির্বাণ পথে ধর্মীয় অনুশাসনে ধ্যান-সমাধি নিয়ে জীবন যাপন করছেন।

তিনি এখন শ্রীমৎ আনন্দপ্রিয় ভিক্ষু বর্তমানে গুরু ভন্তে ছতর পিটুয়া আর্য্য শ্রাবক সঙ্ঘ অরণ্যারাম বিপাসসানা মেডিটেশন সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা ভদন্ত “তিষ্যমিত্র” থেরো এর বিহারে অবস্থান করছেন। ছতর পিটুয়া আর্য্য শ্রাবক সঙ্ঘ অরণ্যারাম মেডিটেশন সেন্টারের আবাসিক ভিক্ষু “শ্রীমৎআনন্দপ্রিয়” এক সাক্ষাতকারে বলেন, সদ্ধর্ম প্রচার ও প্রসারে প্রথমে নিজেকে ধর্মীয় পরিব্যপ্তি শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে তারপর সমাজের ভ্রান্ত ধারণা দূর করার লক্ষ্যে ধর্মীয় সভা, প্রচার পত্র বিলি করে মত প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম। সমাজে অবদানের প্রশ্নে তিনি বলেন, মৈত্রী সম্পন্ন চিত্তে সকলের তরে, কোন বৈষম্য না রেখে সংঘবদ্ধ হয়ে একত্রে কাজ করে ভূমিকা রাখতে চাই।

সুখ ও দুঃখ সম্পর্কে বলেন, আমাদের চতুষ্পার্শে প্রতিক্ষণেই দুঃখ আমাদের পিষে মারছে তথাপি, সত্ত্বগণ পাপে নিবদ্ধ! ক্ষণিকের পাপময় সুখে, মহাদুঃখ লুকায়িত! কেউ দেখে না।কারুরই চৈতন্য নেই! কি আশায় দুঃখ বিনে সুখ আশা করে?!

তিনি শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষা সম্পর্কে বলেন, আজ সমাজে ব্যাক্তি পর্যায়ে এবং সামাজিক পর্যায়ে উৎকর্ষ সাধনের জন্য ধর্মীয় শিক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলে মনে করি বিশেষত শিশু কিশোরদের জন্য।শিশুদের মন কোমল, কল্পনা প্রবন হয়ে থাকে অনেকটা কাঁদা মাটির মত যেমন ভাবে গড়বেন তেমন হবেন।

মনের মধ্যে যে ছাপ পড়ে তা পরবর্তীতে বিকশিত হয়ে থাকে।তাদের এই সময়ে ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করা যায় তাহলে পরবর্তীতে সমাজে রত্ন হিসেবে আলো ছড়াবে।শিষ্টাচার, নম্রতা – ভদ্রতা এবং সুবাধ্যতা অর্জনে ধর্মীয় শিক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ধর্ম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রত্যেক ধর্মাবলম্বীদের উচিৎ নিজের ধর্মকে শ্রদ্ধা করা, ভালোবাসা এবং ভালভাবে জানা। প্রত্যেক ধর্মেই মানব জাতির কল্যাণের কথা বলা হয়েছে। ধর্ম সম্পর্কে না জানা বা অজ্ঞতা হলো ধর্মীয় ও পারিবারিক সুশিক্ষার অভাব। তাই বিহার ভিত্তিক বিভিন্ন ধর্মীয় কর্মকান্ড অনুষ্ঠান আয়োজন করা যেখানে সমাজের সকল মানুষকে সম্পৃক্ত রাখতে হবে। এতে সকলের প্রতি ভ্রার্তৃত্ব বোধ জাগ্রত হবে এবং ধর্মীয় জ্ঞান লাভ করার সুযোগ সৃষ্টি হবে।বোঝাতে হবে যে বৌদ্ধধর্ম কোন কাল্পনিক বিষয় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। মন প্রধান ধর্ম শরীর ও মনের প্রতিক্রিয়ার উপর ভিত্তি করে মনকে নিয়ন্ত্রণ করে কি ভাবে সুখ লাভ করা যায় তা বৈজ্ঞানিক ভাবে রপ্ত করা যায় তা বৌদ্ধ ধর্মে সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রত্যেকে মানুষই যদি নিজের স্বীয় ধর্মকে অনুসরণ করে চলত তাহলে এই বিশ্ব, এই সমাজ আরো সুন্দর হতো আরো সুখের হতো।

বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে তিনি বলেন,স্বয়ং উপলব্ধি যোগ্য বিধায় সকলকে আহ্বান করার যোগ্য ধর্ম হচ্ছে বৌদ্ধধর্ম। যা স্বচক্ষে দর্শন ধর্ম, প্রত্যক্ষ ফলপ্রাপ্তি ধর্ম, সংশয় মুক্ত ধর্ম, এরকম সেরকম বলার মুক্ত ধর্ম নির্দ্বিধায় বলতে পারার ধর্ম হচ্ছে বৌদ্ধধর্ম।

ধ্যান সাধনা সম্পর্কে তিনি নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করে বলেন, ধ্যান করাটা মানেই হচ্ছে গুঁইসাপকে ধরার মতোই, সুত্রে একটি রূপক উপমা দেওয়া হয়েছে, এক লোক একটি গুঁইসাপকে ধরার জন্য চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সেই গুঁইসাপটি বড়সড়ো উইয়ের ঢিবির দিকে দৌঁড় দিয়েছিল।সেই ঢিবিটিতে ছিল ছয়টি গর্ত।এখন গুঁইসাপটি যদি সেই ঢিবিটিতে ঢুকে লুকিয়ে থাকে তাহলে লোকটি কিভাবে সেটিকে ধরবে? প্রথমে তাকে সেই ঢিবিটির ছয়টি গর্তের মধ্যে পাচঁটিকে শক্ত করে বন্ধ করে দিতে হবে এবং মাত্র একটি গর্ত খোলা রাখতে হবে।তারপর তাকে খোলা গর্তের সামনে বসে থাকতে হবে এবং গুঁইসাপটি কখন বের হয় তার জন্য কড়া পাহারা দিতে হবে।যখনই গুঁইসাপটি খোলা গর্ত দিয়ে বের হবে তখন সেটিকে  ধরে ফেলতে সক্ষম হবে এবং মনকে পর্যবেক্ষণ করার ব্যাপারটাও ঠিক এরকম।আপনি চোখ, কান, নাক, জিহ্বা ও দেহ এগুলোকে একদম বন্ধ করে দিন, কেবল মনকে খোলা ও সজাগ রাখুন।এখানে বন্ধ করা মানে হচ্ছে পাচঁটি ইন্দ্রিয়কে সংযত করা, কেবল পর্যবেক্ষণ করার জন্য মনকে খোলা রাখা।ধ্যান করাটাও হচ্ছে ঠিক গুঁইসাপকে ধরার মতোই।

আনন্দপ্রিয় ভিক্ষু আরো বলেন, মনের কর্মকাণ্ড গুলো হচ্ছে প্রাণঘাতী বিষাক্ত সাপের মতো। যদি আমরা একটি বিষাক্ত সাপের পথে বাঁধা হয়ে না দাঁড়াই, তাহলে সেটি কোনো ক্ষতি না করে নিজের মতো করে নিজের পথ দিয়ে সোজা চলে যাবে। এমনকি যদি সেটি মারাত্মক বিষাক্ত সাপও হয়, তাহলেও সেটি আমাদের আক্রমণ করবে না। আমরা যদি সাপটির কাছে না যাই এবং সাপটিকে না ধরি, তাহলে সেটি আমাদের কামড় দেবে না। একটি বিষাক্ত সাপের পক্ষে যা করা স্বাভাবিক তাই সে করে। একটি সাপ যেমন হয়, মনও অনেকটা তেমনই। আপনি যদি বুদ্ধিমান হন তাহলে সাপটিকে একা ছেড়ে দেবেন। অনুরূপভাবে, যেটি ভালো নয় সেটিকে তার মতো হতে দিন এবং আপনি সেটিকে একদম তার নিজের স্বভাব যেমন, সেভাবেই হতে দিন। আপনি কেবল যেটি ভালো সেটিকেও হতে দিন এবং তা গ্রহ্ন করুন, আপনি পছন্দে-অপছন্দের জালে জড়িয়ে যাবেন না, ঠিক অনেকটা বিষাক্ত সাপের পথে বাঁধা হয়ে না দাঁড়ানোর মতো।

একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তির বিভিন্ন মানসিক অবস্থাগুলোর সম্বন্ধে এই জাতীয় মনোভাব থাকবেই যেগুলো তার মনে উৎপন্ন হয়। যখন ভালো কিছু উৎপন্ন হয় তখন আমরা এটিকে ভালো হতে দিই। আমরা এটির স্বভাবটাকে বুঝি। ঠিক অনুরূপভাবে আমরা মন্দটাকেও হতে দিই। আমরা এটিকে তার স্বভাব অনুসারেই হতে দিই। আমরা এটিকে আঁকড়ে ধরি না কারণ আমরা এই রকম কোনো কিছু চাই না। আমরা খারাপ কিছু চাই না। আমরা ভালো কিছুও চাই না। আমরা হালকা বা ভারি অথবা সুখ বা দুঃখ কোনোটাই চাই না। আমাদের মন বিচলিত থাকে কিন্তু  যখনি আমাদের সমস্ত চাওয়া গুলো শেষ হয়, কেবল তখনি শান্তি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় কারন আসক্তি বা আকাঙ্ক্ষা থাকলেই লোভের সৃষ্টি হয়।

আর রাগ হচ্ছে সাময়িক পাগলামি মাত্র, অন্য লোকেরা আপনার ওপর মাঝে মধ্যে রেগে যেতে পারে, এমনকি আপনার প্রিয়জনরাও। এটি আমাদের সবার ক্ষেত্রেই ঘটে। কিছু মানুষ এমনকি বুদ্ধের ওপরও রেগে যান। তাহলে, অন্যজনের রাগের লক্ষ্য যদি আপনি হন তখন আপনি কী করতে পারেন?

পাপ অথবা পূণ্য যে যেটিই করুক না কেন, তৃষ্ণা, মান, দৃষ্টি হলো মুক্তির পথে মূল শত্রু।এমনকি পঞ্চ অন্তরায় কর্ম করতেও দ্বিধা করে না এই তৃষ্ণা, মান ও দৃষ্টি।সংসার দীর্ঘ করে তৃষ্ণা, মান, দৃষ্টি।এই তৃষ্ণা, মান ও দৃষ্টির কারণে অপায়, অন্তরায় কল্প, বৈরী, বিপত্তি, ব্যসন, অক্ষণ, ভয়, দণ্ড ও বিবিধ রোগের উৎপত্তি হয়।

সমাজ গঠনে এবং ধর্মীয় চেতনা বিস্তারে ভিক্ষুদের অবদান সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে আনন্দপ্রিয় ভিক্ষু বলেন, আমাদের দেশে বৌদ্ধ সমাজ এতটুকু দাঁড়ানোর পিছনে আমাদের পূজনীয় ভিক্ষুসংঘের অবদান অপরিসীম। এখানে নাম উল্লেখ না করলেও আমাদের সবার মধ্যে এই অনুভব বিদ্যমান। তাই নমস্য, পরমপূজনীয়, সর্বজন শ্রদ্ধেয় কালগত ভিক্ষুসংঘ, মহাজ্ঞানী মনীষিদের প্রতি আমার, আমাদের প্রজন্মের বন্দনা জানাই, বর্তমান সময়ে আমাদের জ্ঞানের ভান্ডার সমৃদ্ধ করণে ভিক্ষুসংঘের অবদান কোন কিছুর সাথে তুলনীয় নয়। সকল ভিক্ষুসংঘের প্রতি পাদমূলে বন্দনা নিবেদন করছি। সর্বে সত্তা সুখীতা হুন্তু জগতের সকল প্রাণী সুখী হউক।সর্বপ্রকার দুঃখ হতে মুক্তি লাভ করুক।

One thought on “মনের কর্মকাণ্ড গুলো হচ্ছে প্রাণঘাতী বিষাক্ত সাপের মতো

  • June 4, 2018 at 4:04 PM
    Permalink

    নাগরিক নিউজ এর সম্পাদক মহোদয়কে ধন্যবাদ জানাই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করার জন্য । এবং নাগরিক নিউজ পরিবারের সকল সদস্যদের জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error

নিউজ টি শেয়ার করুন :)

Instagram
LinkedIn
Share
Follow by Email