ব্যাটারী পুড়িয়ে সীসা সংগ্রহ, গাজীপুরে গবাদি পশু মড়ক

মুহাম্মদ আতিকুর রহমান, গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি:   ব্যাটারী পুড়িয়ে সীসা সংগ্রহ করার কারনে গাজীপুরের শ্রীপুরের তেলিহাটি ইউপির উত্তর পেলাইদে গবাদি পশু মড়কের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সীসা সংগ্রহের জন্য ব্যাটারী পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট গ্যাসের কারণে মড়ক দেখা দিয়েছে বলে স্থানীয় কৃষকেরা দাবী করেছেন।

উত্তর পেলাইদ গ্রামে অবস্থিত বিষাক্ত ক্যামিকেল শিশা ফ্যাক্টরী বন্ধের দাবি জানিয়ে মানব বন্ধন করেছে এলাকাবাসী ।

উত্তর পেলাইদ গ্রামের বিধবা হোসনা বেগমের দুটি ষাঁড় ও একটি গাভী ছিল। গাভীর দুধ বিক্রি করে দুই ছেলের ভরন পোষন ও জীবিকা নির্বাহ করতেন। গত চার মাস আগে ব্যাটারী কারখানার আশপাশে গরুর ঘাস খাওয়াতে গেলে দুই মাসের ব্যবধানে তার তিনটি গরু মারা যায়। টাকার অভাবে সে পরবর্তী সময়ে আর গরু ক্রয় করতে পারেননি। বর্তমানে অতি কষ্টে তিনি জীবিকা নির্বাহ করছেন। হোসনা বেগম গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার উতত্তর পেলাইদ গ্রামের বাসিন্দা।

সীসা সংগ্রহের জন্য ব্যাটারী পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট গ্যাসের কারণে মড়ক দেখা দিয়েছে বলে স্থানীয় কৃষকেরা দাবী করেছেন।

৬ জুলাই বৃহস্পতিবার দুপুরে স্থানীয় কৃষক মোন্তাজ উদ্দিনেরও একটি গরু মারা গেছে। ওই এলাকায় তিনটি ব্যাটারী পোড়ানোর কারখানা রয়েছে, যার একটিরও পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি নেই। তবে কারখানার কর্মচারীরা দাবী করেছেন থানার অনুমতি নিয়ে কারখানাগুলো তারা পরিচালনা করছেন। কৃষকেরা বৃহস্পতিবার বিকেল পাঁচটায় উত্তর পেলাইদ এলাকায় সীসা কারখানা বন্ধের দাবী জানিয়ে মানববন্ধন করেছেন।

উত্তর পেলাইদ এলাকার দোখলা ব্রিজের দুই পাশে দুটি ও সিসিডিবি সড়কের পাশে একটি কারখানা রয়েছে। সরেজমিন দেখা গেছে কারখানাগুলোর আশপাশে পরিচিতিমূলক কোনো সাইনবোর্ড নেই। ভেতরে গর্ত করে আগুন ধরিয়ে সেখানে ব্যাটারী পোড়ানো হয়। আগুনে পুড়ে ব্যাটারী থেকে গলিত সীষা বের হচ্ছে। ওই সীসা প্লেটের আকারে সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

কৃষক মাজহারুল হক বলেন, ব্যাটারী কারখানার আশপাশের পতিত জমিতে গরু ঘাস খাওয়াতে গেলে তিন মাসে একটি ও ৬ মাস আগে দুটি গরু মারা যায়।

কৃষক আক্কাস আলী জানান, একটি ষাঁড় ও একটি গাভী গত এক বছর আগে ব্যাটারী কারখানার গ্যাসের প্রভাবে মারা যায়।

কৃষক হারুন অর রশীদ জানান, গত আট মাস আগে তার একটি ষাঁড় গরু মারা যায়। দোখলা ব্রিজের পানি ও খাল পাড়ের পানি খেয়ে গরু দুটি মারা যায়।

কৃষক শহীদ জানান, তার একটি গরু গত পাঁচ মাস আগে মারা যায়। চারপাশে টিনেরে বেড়া দিয়ে রাত আটটার পর থেকে ব্যাটারী পুড়িয়ে সীসা সংগ্রহ শুরু হয়।

স্থানীয়রা জানায়, জমি ভাড়া নিয়ে বহিরাগত লোকজন এসব কারখানা গড়ে তোলেছে। প্রভাবশালীদের একটি চক্র এসবের সাথে জড়িত থাকায় কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না।

কৃষক মোন্তাজ উদ্দিন বলেন, উপায়ন্তর না দেখে আমরা আজ মানববন্ধন করতে বাধ্য হয়েছি।

এক কারখানায় গিয়ে জানা গেছে ঢাকার বাবু মিয়া নামে একজন কারখানাটি পরিচালনা করছেন। জাকির হোসেন নামে তার এক কর্মচারী জানান, কর্তৃপক্ষ থানার অনুমতি নিয়ে ভাড়া জমিতে কারখানা চালাচ্ছেন।

এ ব্যাপারে জমির মালিক ইউনুস আলী জানান, কারখানার কারণে এলাকার পরিবেশের কোনো ক্ষতি হয় না।

তেলিহাটী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল বাতেন সরকার বলেন, স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে এমন অভিযোগ অনেক দিন থেকে পেয়ে আসছি। এ ব্যাপারে কারখানা মালিকদের নিষেধ করা সত্ত্বেও রাতের আঁধারে ব্যাটারী পুড়িয়ে সীসা সংগ্রহ করছে। এতে কয়েক বছর যাবত ওই এলাকায় গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগীর মড়ক দেখা দিয়েছে। এদেরকে সমূলে উচ্ছেদ করা দরকার। এ কারখানার কারণে ভবিষ্যতে ওই এলাকায় বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হবে।

এসব বিষয়ে শ্রীপুর উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ আব্দুল জলিল বলেন, এ অভিযোগ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে পাওয়া গেছে। উপজেলার গাজীপুর, গোসিঙ্গা, পটকা, বেড়াবাড়ী এলাকাতেও ব্যাটারী পোড়ানোর কারখানা গড়ে উঠেছিল। পরে ওইসব কারখানার আশপাশে গবাদি পশুর মড়ক শুরু হয়। এরপর এলাকাবাসীর চাপের মুখে কোনো কোনো কারখানা মালিক কৃষকদের জরিমানা পরিশোধ করেছে। আবার কোনো কর্তৃপক্ষ কারখানা বন্ধ করে এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। কারখানা বন্ধ করে দেয়ার পর গবাদি পশুর আর মড়ক দেখা যায় না।

শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদুজ্জামান জানান, থানা থেকে কারখানার পরিবেশের কোনো অনুমোদন দেয়া হয় না। যারা বলেছে তারা মিথ্যা কথা বলেছে। শুক্রবারই কারখানা সনাক্ত করে এসবের ব্যাপারে অভিযান চলবে। এদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।

মুকিম // শনিবার , ০৭ জুলাই ২০১৮, ২৩ আষাঢ় ১৪২৫, ২২ শাওয়াল ১৪৩৯

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error

নিউজ টি শেয়ার করুন :)

Instagram
LinkedIn
Share
Follow by Email