বাংলাদেশের তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির ক্ষেত্রে অন্তরায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা

বাংলাদেশের তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি করার ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে আবারও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতার কথাই বললেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ।

তিনি বলেছেন, শুধু বাংলাদেশ সরকার এবং ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে এই জট ছাড়ানো সম্ভবপর নয়।

সোমবার নয়া দিল্লিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে বার্ষিক সংবাদ সম্মেলনে একথা বলেন সুষমা স্বরাজ।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ভারত সফরের মধ্যে তিস্তা চুক্তির বিষয়টি আলোচনায় আসার প্রেক্ষাপটে এনিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েছিলেন তিনি।

তিস্তা চুক্তির অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে সুষমা বলেন, “দেখুন, শুধু দুই কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে, বাংলাদেশ সরকার এবং ভারত সরকার, তিস্তার সমাধান করা সম্ভব না। এখানে বড় অংশজুড়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ভূমিকা রয়েছে।

“যেমনটা আমি বলেছি তৃতীয় স্টেক হোল্ডার রয়েছে। তাকে সম্পৃক্ত না করে কোনো সিদ্ধান্ত নিলেও সেটা বাস্তবায়ন কী করে করবেন? পানি তো পশ্চিমবঙ্গের মধ্য দিয়ে যাবে। এ জন্যই আমরা বারবার মমতা ব্যানার্জীর সঙ্গে আলোচনার কথা বলি।”

তাই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে রাজি করিয়েই তিস্তা চুক্তি করতে চাওয়ার কথা জানান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

অর্ধ যুগ আগে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় ঝুলে যাওয়ার পর তিস্তার জট আর খোলেনি। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতার আপত্তিই এর কারণ।

নয়া দিল্লিতে পালাবদলে ক্ষমতায় আসা বিজেপির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আশা দিলেও এখনও মমতাকে রাজি করাতে পারেননি।

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য তিস্তার পানি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে দ্বিপক্ষীয় যে কোনো বৈঠকেই ঢাকার পক্ষ থেকে নয়া দিল্লিকে তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।

সুষমা বলেন, “এর আগে যখন শেখ হাসিনা এসেছিলেন, তখন তিনি (মমতা) এক বিকল্প সমাধান দিয়েছিলেন।

“তিনি (মমতা) বলেছিলেন, তিস্তা বাদ দিয়ে অন্য তিন নদীর পানি নিন। যতটুকু পানি তিস্তা থেকে আপনারা পাবেন একই পরিমাণ পাওয়া যাবে এই তিন নদী থেকে। এতে তিস্তা বেঁচে যাবে, আর আপনারাও পানি পাবেন।”

মমতার এই প্রস্তাবের সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখার কথা জানিয়ে সুষমা বলেন, “একটি ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হচ্ছে। যেখানে পশ্চিমবঙ্গ থেকে জনবল রয়েছে, আমাদের দিক থেকে ওয়াটার রিসোর্সের জনবলও রয়েছে। এই প্রতিবেদন এখনও শেষ হয়নি।”

বাংলাদেশের সঙ্গে অমীংসিত বিভিন্ন সমস্যার সমাধান হলেও তিস্তা চুক্তি এখনও না হওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যর্থতা এখনই স্বীকার করতে নারাজ সুষমা।

“এখনও আমাদের (সরকারের) এক বছর বাকি। এখনই আমাদের ব্যর্থ বলাটা ঠিক নয়। অপেক্ষা করুন। আমরা লেগে আছি।”

মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্কটের বিষয়ে ভারতের অবস্থান নিয়েও সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন সুষমাকে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী শরণার্থী প্রত্যাবাসন হবে বলে তিনি আশাবাদী।

“আমি দুই পক্ষের সঙ্গে আলাপে জেনে সন্তুষ্ট হয়েছি যে, বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মাঝে একটি সমঝোতা হয়েছে। এতে সময় সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে যে দুই বছরের মধ্যে এই রিপ্যাট্রিয়েশন শেষ করা হবে।”

নিজের মিয়ানমার সফরের কথা তুল ধরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমি সু চির (অং সান সু চি) কাছ থেকে তালিকা পেয়েছি, পরে যা গণমাধ্যমেও এসেছে, ১২২২ লোককে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে ভেরিফাই করে বাংলাদেশকে দেওয়া হয়েছে। তারা এদের ফেরৎ নিতে প্রস্তুত।
“একে বেবি স্টেপ বলা যেতে পারে, সফলতার প্রথম পদক্ষেপ। সমঝোতার পরে ১২২২ জনকে ফেরৎ নেওয়া হচ্ছে। আমি মনে করি, দুই দেশ আন্তরিকতার সঙ্গে সমঝোতা করলে এই সংকটের একটি স্থায়ী সমাধান অবশ্যই হবে।”

রোহিঙ্গা সঙ্কটে ভারতকে নিয়ে বাংলাদেশের কোনো অভিযোগ না থাকার কথা সাংবাদিকদের বলেন সুষমা।

মিয়ানমার শরণার্থী নিতে চাইছে না বলে এক সাংবাদিক বলার পর তাকে সুষমা বলেন, “আপনি যে বললেন, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরৎ নিতে অস্বীকার করেছে, তা সম্পূর্ণ ভুল।”

গত অগাস্টে মিয়ানমারের রাখাইনে সেনা অভিযান শুরুর পর নির্যাতনের মুখে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছেন। তাদের ফেরত নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েও মিয়ানমার গড়িমসি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশে আগে থেকে আরও চার লাখের মতো রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে আছে। বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর ভার নিয়ে সঙ্কটে পড়ার কথা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে জানিয়ে আসছে বাংলাদেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error

নিউজ টি শেয়ার করুন :)

Instagram
LinkedIn
Share
Follow by Email