পাতালের ভেষজ গাছপালা-জায়েদ ফরিদ

পাতালের ভেষজ গাছপালা জায়গাটার চারদিকে দেড় হাজার ফুট খাড়া পাহাড়ি দেয়াল। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে কেবল ভর দুপুরেই দেখা যায় কিছুটা সূর্যের আলো। দুপুর গড়াতে না গড়াতেই ঘনীভূত হয় অন্ধকার। সকালে সূর্যের দেখা নেই, বিকেল শুরু হতেই পাহাড়ের আড়ালে ডুবে যায় সূর্য। দিনটা অস্বাভাবিক রকম ছোট, রাতটা অনেক লম্বা। অন্ধকার ঘনালেই পরিবারের মানুষরা ঘরে ফিরে যায়। ঘরের মেঝেতে বেড় পাকানো গোক্ষুর, দেয়াল বেয়ে নেমে আসছে বৃশ্চিক, এর মধ্যে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে বাস করে ভারিয়া উপজাতির মানুষ। এদের ভাষাটাও অদ্ভুত, কোনো ভবিষ্যৎকাল নেই ভাষায়, সবই বর্তমান। কেবল বর্তমান নিয়েই হরিনাম যপ করে জীবন অতিবাহিত করে পাতালকোটের মানুষ। ঊষর ভূমি থেকে বজরা-জাতীয় সামান্য যা কিছু ফসল, ফলমূল, কন্দ বা মহুয়ার মদ্য যাই হোক, দেবতার পূজা না দিয়ে তারা খাদ্য গ্রহণ করে না। পরিবারের কেউ মারা গেলে হিন্দুমতে শ্মশান সৎকারের পর পাথরে তার প্রতিকৃতি বানিয়ে ঘরের কাছেই একটি পারিবারিক প্রতীকী গোরস্তানে রেখে দেয়, মৃত্যুর পরও স্নেহ মায়ামমতায় আপন হয়ে থাকে মৃতরা।

ভারতে মধ্যপ্রদেশের ছিনদুয়ারা জেলার অন্তর্গত পাতালকোট উপত্যকা, সাতপুরা পাহাড়শ্রেণীর ৮০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে অবস্থিত। এখানে ১২টি গ্রামে বাস করে হাজার দুয়েক মানুষ, যার বেশিরভাগ ‘ভারিয়া’ হলেও ১৫ শতাংশ মিশ্রিত আছে ‘গণ্ড’ ও অন্যান্য উপজাতীর মানুষ। অন্তত ৫০০ বছর আগে থেকে এখানে ভারিয়ারা বাস করে আসছে। মাত্র কয়েক দশক আগেও বহির্বিশ্বের সঙ্গে পাতালকোটসীদের কোনো যোগাযোগ ছিল না। পাহাড়ের উপরে সমতল মালভূমিতে যেসব মানুষ বাস করে তারা দূরত্বে নিকট হলেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার উপায় ছিল সীমিত। পাথর আর গাছের শিকড় বেয়ে বহু কষ্টে তাদের উপরে উঠতে হত, নামতে হত আরো কষ্ট করে। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র সিংয়ের পাতালকোট পরিদর্শনের সময় পাথরের সিড়ি তৈরি হয়েছিল যা ৫০ দশকের পর থেকে জল-বৃষ্টিতে ক্ষয়ে বর্তমানে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।

অসুখবিসুখে এখানকার আদিবাসীদের জঙ্গলের ভেষজ গাছগাছড়ার উপরেই নির্ভর করতে হয়েছে চিরকাল। আমাদের দেশে যেমন কবিরাজ, আমাজনে বা কঙ্গোতে ‘শেম্যান’ তেমনি এখানে রয়েছে ‘ভূম্‌কা’। সমাজে এদের অবস্থান সম্মানজনক, বলতে গেলে দেবতাদের পরপরই। শতশত বছর ধরে ভূমকারা ভেষজ নিয়ে নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মূল্যবান অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। ভেষজ ওষুধের দিকে বর্তমানে ঝুঁকে পড়া পৃথিবীর জন্য এই অভিজ্ঞতা অনেক জরুরি। আগে ভূমকারা বংশপরম্পরায় তাদের লব্ধ জ্ঞান পরবর্তী প্রজন্মকে দিয়ে যেত, কিন্তু এখন সেই সনাতন নিয়মের ব্যতিক্রম দেখা দিয়েছে। পাহাড়ের উপর-অঞ্চলের মানুষের আর্থিক লোভ পড়েছে পাতালের গাছপালার প্রতি। নির্বনায়নের ফলে ভারিয়াদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য, ভেষজ সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য। হাটবাজারের কিছু ওষুধ হাতের কাছে পাওয়াতে তারা ভাবতে শুরু করেছে তাদের আর জঙ্গলের ওষুধের দরকার নেই। অনেক দরিদ্র ভারিয়া ও গণ্ড উপজাতির মানুষ উপরের মালভূমিতে উঠে গিয়ে শ্রমজীবী হিসাবে জীবিকা নির্বাহের বন্দোবস্ত করছে। অতএব এখনই যদি তাদের লব্ধ ভেষজ ও চিকিৎসাজ্ঞানটুকু আমরা সংগ্রহ করতে না পারি তবে তা চিরতরে বিলীন হয়ে যাবে, যেমনটা হয়েছে কঙ্গো-আমাজনেও। এই জ্ঞান আহরণের জন্য অবিরাম কাজ করছেন নিবেদিতপ্রাণ গবেষক ডঃ দীপক আচার্য। মাইক্রোবায়োলজিতে পড়াশোনা করলেও ভেষজের গুণাগুণ নিয়ে তিনি ঝুঁকে পড়েছেন এথ্‌নোবটানির দিকে।

আকাশ আর পাতালের মাঝামাঝি মর্ত্যে বাস করি আমরা। আকাশকে ভালবাসি, দর্শন করি কিন্তু পাতালকে দেখার সুযোগ নেই, কল্পনাতেও মাথায় আসতে চায় না। অতল, বিতল, সুতল, তলাতল, মহাতল, রসাতল ও পাতাল এই ৭ রকম অধোভুবনের মধ্যে আছে পাতাল। অদ্ভুতরকম এই ভিন্ন জগতের উল্লেখ আছে বাল্মিকী রচিত রামায়ণে। মাইকেল মধুসূদনের ‘মেঘনাদবধ’ মহাকাব্যেও এর উল্লেখ আছে যা লিখে সাহিত্যজগতে অমর হয়ে আছেন তিনি। মেঘনাদ ছিলেন রাবণের পুত্র, ইন্দ্রিয়কে জয় করেছিলেন বলে তার আরেক নাম ইন্দ্রজিৎ। পাতালের নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে তিনি নিহত হয়েছিলেন রামের ছোট ভাই লক্ষ্মণ কর্তৃক। এসব মহাকাব্যে সীতাদেবী ও হনুমানের পাতালে অবস্থানের কথা জানা যায়। পাতালে প্রবেশের জন্য পৃথিবীতে কয়েকটি দ্বার আছে বলে মনে করা হয় যার দুটি অন্তত আমাদের পরিচিত, একটি লঙ্কা দ্বীপ আরেকটি ভারতের মধ্যপ্রদেশের পাতালকোট। কিংবদন্তী আছে, এখান থেকে রয়েছে পাতালে যাওয়ার রাস্তা, ভূমিধ্বসে যে গুহার মুখ বন্ধ হয়ে আছে বর্তমানে।

সাতপুরা পাহাড়শ্রেণীর মেটামরফিক ও গন্ডয়ানা শিলাস্তরের ক্ষয়হেতু যে মাটি তৈরি হয়েছে পাতালকোটে তা বেশ অনুর্বর। মৌসুমী বৃষ্টিপাত ৫০-৬০ ইঞ্চির মত। তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৪০ ও সর্বনিম্ন ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এখানকার দুটি নদীর বড়টি ‘দুধি’ যার সঙ্গে মিলিত হয়েছে ক্ষীণকায়া ‘গাইনি’। আগে কিছু পশু শিকার করলেও এখন ভারিয়ারা বেশিরভাগ সময় মাছ ধরে যা এসব নদীতে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। এখনো কিছু বাঘ, ভল্লুক, চিতাবাঘ, হরিণ, বনবিড়াল ইত্যাদি প্রাণী আছে এই বনে। সবচেয়ে বেশি দেখা যায় মুখপোড়া হনুমান যারা ফলমূল ও শস্য নষ্ট করে। কিন্তু ভারিয়ারা এদের আপন মনেই চলতে দেয়, কারণ এক হনুমানকে হত্যা করলে হাজার হনুমান প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে। হনুমান আম খেয়ে ফেললে আমের আঁটিগুলো সংগ্রহ করে এক ধরনের আটা বানিয়ে খায় ভারিয়ারা।

পাতালকোটের বনাঞ্চলে বড় গাছের মধ্যে প্রচুর শালগাছ (Shorea robusta) দেখা যায়। এখানে বিড়ি তৈরির জন্য ব্যবহৃত টেন্ডু পাতার গাছ (Diospyros tomentosa) দেখা যায় যার ফল খায় আদিবাসীরা। এ ছাড়া উলটচণ্ডাল (Gloriosa superba), অন্তমূল (Tylophora indica), অনন্তমূল (Hemidesmus indicus), মেষশৃঙ্গী (Gymnema sylvestre), আকর কারা (Spilanthes calva), হরিতকি, অর্জুন, মেহেদি, সরুফা, শিবলিঙ্গী ইত্যাদি গাছ দেখা যায়। চরক সংহিতায় উল্লিখিত মেষশৃঙ্গী গাছের লোকায়ত হিন্দি নাম ‘গুরমার’ অর্থাৎ যা মিষ্টিকে নস্যাৎ করে। বহুবর্ষজীবী এই কাষ্ঠল লতার বৈশিষ্ট্য হল, এর পাতার রস মুখে গেলে জিভের মিষ্টস্বাদ গ্রহণের ক্ষমতা লোপ পায় কিন্তু টক বা লবণাক্ত স্বাদের কোনো তারতম্য হয় না। ডায়াবেটিসের ওষুধের সঙ্গে এটি একটি উত্তম পথ্য। চক্ষু, দন্ত, পাকস্থলী, অর্শ ও হৃদরোগের জন্য এর ব্যবহার ছাড়াও জাপান এই ভেষজ টন পরিমাণে আমদানি করে মেদবাহুল্য কমানোর জন্য। এখন এসব গুরমার লতার পরিমাণ অনেক কমে গেছে কারণ বড় গাছ কেটে ফেলার পর লতানো গাছ বেড়ে ওঠার কোনো অবলম্বন পাচ্ছে না। যে কোনো জ্বরের জন্য এরা ব্যবহার করে অশ্বত্থ, আমলকি ও চিত্রকের (Plumbago zelaynica) মিশ্রণ। কফ-ঠাণ্ডার জন্য এরা আট-দশটা গোলমরিচ এককাপ জলে মিনিট বিশেক জ্বাল দিয়ে সরাসরি পান করে চাদর গায়ে শুয়ে পড়ে। কৃমিনাশের জন্য টমেটো জুসের সঙ্গে গোলমরিচের গুঁড়ো মিশিয়ে বাচ্চাদের খাওয়ানো হয়। আমাশয় রোগে জিরা, আমের বীচি, মৌরি ও আদা-গুঁড়ার মিশ্রণ জলসহযোগে পান করে, শুধু জিরা-মৌরিও খায় অনেক গ্রামে। মুখের ঘা-তে ব্যবহার করে পোড়ানো তরমুজের খোসা। একজিমার উপরে পলাশের তেল ছাড়াও সমপরিমাণ গাঁদা ও চাকুন্দা (Senna tora) পাতার রসের প্রলেপ দেয়। চুল শক্ত হওয়ার জন্য ভারিয়া মেয়েরা আমলকির পেস্ট প্রয়োগ করে চান্দিতে এবং খুশকি দূর করার জন্য রাতে ভিজিয়ে রাখা রিঠা ফলের জল দিয়ে সকালবেলা শ্যাম্পু করে।

পাতালকোটের ভারিয়া ও গণ্ড, এই দুটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা সম্পর্কে ১৯৪৫ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত ত্রিশ বছর অধ্যয়ন করে জনাব এ. এম. কুরুপ লিখেছেন অনবদ্য বই ‘Continuity and change in a little community’ যখন উপজাতীয় লোকের সংখ্যা ছিল আরো অনেক কম। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর জমিদারী প্রথার বিলোপ ও প্রকাণ্ড ভূমিধ্বসে পাতালকোটবাসীদের পর্যুদস্ত জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিল। এ কারণে ১৯৪৫ সাল থেকে পর্যবেক্ষণের জন্য উৎকৃষ্ট সময় মনে করেছিলেন তিনি। হাল আমলে সরেজমিনে কাজ করছেন ডঃ দীপক আচার্য, যে কাজের জন্য উনি পাতালকোটবাসীদের ভাষাও রপ্ত করে নিয়েছেন। যেহেতু পৃথিবী ক্রমশ ভেষজ ঔষধের দিকে মনোযোগী হয়েছে আমাদের একটি সহজ কর্তব্য হতে পারে অভিজ্ঞ প্রবীণ, বৃদ্ধ এবং কবিরাজদের কাছ থেকে অন্তত সাধারণ অসুখের জন্য লোকায়ত ব্যবহার সম্পর্কে জেনে রাখা।

ছবি-১ সাতপুরা পাহাড়শ্রেণী বেষ্টিত পাতালকোটের অংশবিশেষ- সূত্রঃ Scout my trip
ছবি-২ পাতালকোটের আদিবাসী ‘ভারিয়া’- সূত্রঃ The better India
ছবি-৩ পাথুরে পথ- সূত্রঃ HolidayIQ
ছবি-৪ দুধি নদীর শিলাময় তীর- সূত্রঃ Ashoke Munne, Patakot Trekking

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error

নিউজ টি শেয়ার করুন :)

Instagram
LinkedIn
Share
Follow by Email