পটুয়াখালী শহরের জলবায়ু পরিবর্তনে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট

নদীর দেশে চলছে ‘পানির জন্য কান্না’, চলছে হাহাকার। প্রতিদিনই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এ কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে পটুয়াখালী পৌর শহরের সর্বত্র। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পটুয়াখালী পৌর এলাকায় পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

এ পৌর শহরে পানির স্তর ৩২ ফিট নিচে নেমে যাওয়ায় ১ হাজার ১৫০টির মধ্যে অর্ধেক টিউবওয়েলেই পানি উঠছে না। এ কারণে এই পৌর শহরে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পৌরবাসীর মধ্যে পানির জন্য আহাজারি চলছে। বিশেষ করে এই রমজান মাসে বিশুদ্ধ পানির জন্য রোজাদারদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। একটু বিশুদ্ধ পানির জন্য এ বাড়ি, ও বাড়ির আঙ্গিনায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন তারা।

পটুয়াখালী জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাম্প্রতিককালে পটুয়াখালীসহ দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে আবহাওয়ার বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে নিচে নেমে গেছে। হস্তচালিত গভীর নলকূপে পানি উত্তোলন ক্ষমতা ২৬ ফিট পর্যন্ত। কিন্তু সেখানে এখন পানির স্তর নেমে গেছে ৩২ ফিট নিচে। যেখানে ২০১৬ সালে পানির স্তর ছিল ২৪ ফিটে এবং ২০১৭ সালে ছিল ২৬ ফিট নিচে।

জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর আরও জানায়, পটুয়াখালী পৌর এলাকায় দেড় ইঞ্চি ব্যসের গভীর নলকূপ রয়েছে ১ হাজার ১৫০টি। এর মধ্যে সরকারি রয়েছে ৮৫০টি এবং ব্যক্তিগত রয়েছে ৩০০টি। পটুয়াখালী পৌর শহরে গভীর নলকূপের জন্য দু’টি লেয়ার রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম লেয়ারে পানি উত্তোলনের ধারণ ক্ষমতা রয়েছে ৮৮০ ফিট থেকে ৯৪০ ফিটের মধ্যে এবং দ্বিতীয় লেয়ারে রয়েছে ১০১০ থেকে ১১০০ ফিটের মধ্যে। কিন্তু পানির স্থিতিতল অস্বাভাবিক নিচে (৩২ ফিটে) নেমে যাওয়ায় বর্তমানে দ্বিতীয় লেয়ারেও কাজ হচ্ছে না। এ কারণে শহরের গভীর নলকূপগুলোতে পানি উঠছে না। ওইসব নলকূপে পানি পেতে এখন ১১৪০ থেকে ১১৮০ ফিট পর্যন্ত পাইপ বসাতে হচ্ছে।

যারা ১১৪০ থেকে ১১৮০ ফিট পর্যন্ত পাইপ বসিয়েছেন একমাত্র তারাই পানি উত্তোলন করতে পারছেন। এছাড়া পৌর শহরের পানির এ সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে ৭টি উৎপাদক নলকূপ বসানো হচ্ছে। এর মধ্যে ৩টির কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং ৪টির কাজ চলমান রয়েছে। প্রতিটি উৎপাদক নলকূপ বসাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২০ লাখ টাকা করে। এছাড়াও আরও দু’টি পানির ওভারহেট ট্যাংকিও করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে টেন্ডারও আহ্বান করা হয়েছে। কিন্তু দরপত্রে রেট কম হওয়ায় কোনো ঠিকাদার এ টেন্ডারে অংশ গ্রহণ করছেন না। ফলে ওভারহেট ট্যাংকি নির্মাণের কাজ শুরু করতে পারছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

অন্যদিকে পৌর কর্তৃপক্ষ জানায়, ১৮৯২ সালের ১ এপ্রিল পটুয়াখালী পৌরসভাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ৩০ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট এ পৌরসভায় প্রায় দেড় লাখ লোকের বসবাস রয়েছে। ১৯৮০ সালে পৌর কর্তৃপক্ষ পৌরবাসী পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করে। এর আগে জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর পৌরবাসীকে পানি সরবরাহ করতো। শুরুতে ৫টি উৎপাদক নলকূপের মাধ্যমে সাড়ে ৭ কিলোমিটার পাইপ লাইনে পৌরবাসীকে পানি সরবরাহ করা হয়।
২০০৪ সালে ডানিডার প্রকল্পের মাধ্যমে দু’টি ওভারহেট ট্যাংকির কাজ শেষ হলে ৫৮ কিলোমিটার পাইপ লাইনে পানি সরবরাহ শুরু হলে ১ হাজার ৮০০ গৃহলাইন সংযোগ দেয়া হয় এবং ২০১১ সালে ২ হাজার ৮০০ গৃহলাইন সংযোগে উন্নীত করা হয়।

পরবর্তীতে পৌরসভার নিজস্ব খরচে আরও দু’টি উৎপাদক নলকূপ স্থাপন করা হয়। এতে ২০১৪ সালে গৃহসংযোগ পানির লাইন দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২০০টিতে। পরবর্তীতে দেশের ৩৭ জেলায় পানি সরবরাহের আওতায় ডিপিএইচই ও পৌরসভার সমন্বয়ে ৭টি উৎপাদক নলকূপ স্থাপনের কাজ শুরু হয়। যার মধ্যে ৩টির কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং একটি ইতোমধ্যে চালুও হয়েছে। বাকি ৪টির কাজ চলমান রয়েছে।

এ শহরে হাতেগোনা কয়েকটি টিউবওয়েলে পানি উঠলেও সেখান থেকে বিশুদ্ধ পানি নেয়ার জন্য পুরোদমে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। কার আগে কে পানি নেবে এ নিয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলে কাড়াকাড়ি।

শহরের চরপাড়া এলাকার গৃহকর্মী আসমা আক্তার বলেন, ‘মুই চাইর বাসায় পানি দেই। পানির অভাব দেইখ্যা একবারে ৪/৫ কলস কইরা আইন্না রাহি। এতে সপ্তাহখানেক যায়। শ্যাষ হইয়া গ্যালে আবার আইন্না রাহি’।

পুরাতন হাসপাতাল রোড এলাকার অ্যাডভোকেট শাহিন মিয়া বলেন, ‘পৌর এলাকায় পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। এ কারণে গভীর টিউবওয়েলে সুপেয় পানি উঠছে না। এতে সুপেয় পানির জন্য মানুষের ভীষণ দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এ কারণে আমার বাসার টিউবওয়েল থেকে পাইপ দিয়ে এলাকার মানুষদের সুপেয় পানি সরবরাহ করতে হচ্ছে। ঈদের আগেই এ সমস্যাটির সমাধান হওয়া দরকার’।

পুরাতন হাসপাতাল রোডের গৃহকর্ত্রী রওশন আরা বেগম বলেন, ‘আমাদের এ এলাকার টিউবওয়েলে পানি উঠছে না। ১৪/১৫ দিন যাবৎ পানির জন্য দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ২/৩ দিন পর পর ৫/৬টি কলস এক সঙ্গে পানি ভরে নিয়ে রাখি এবং তা দিয়ে কয়েকদিন চলি। রমজান মাস হওয়ায় এ জন্য দুর্ভোগটা বেশি পোহাতে হচ্ছে’।

শহরের জুবিলী স্কুল সড়কের গৃহকর্ত্রী আফসানা বেগম বলেন, ‘এ রমজান মাসে আমারা সময় মতন ওজু-গোসল করতে পারছি না। আমাদের খুব কষ্ট হচ্ছে। আমরা চাই আমাদের পানির এই সমস্যা দ্রুত সমাধান করা হোক’।

পুরাতন হাসপাতাল রোডের গৃহকর্ত্রী মুক্তা রানী ঘোষ বলেন, ‘আমরা ১৮/২০ দির যাবৎ পানির জন্য দুর্ভোগ পোহাচ্ছি। শাহিন ভাই তার টিউবওয়েল থেকে আমাদেরকে পানি না দিতো তাহলে আমাদের পানি না খেয়ে থাকতে হতো’।

পটুয়াখালী জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার শামসুল ইসলাম জানান, পটুয়াখালী পৌর এলাকায় পানির স্তর অস্বাভাবিক নিচে নেমে গেছে। বর্তমানে পৌর শহরে পানির স্থিতিতল রয়েছে ৩২ ফিটে। এছাড়া শহরে অতিরিক্ত গভীর নলকূপ স্থাপন এবং এক সঙ্গে অতিরিক্ত পানি উত্তোলন করায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে এ সমস্যা যাতে দ্রুত সমাধান করা যায় এ জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। আশা করি খুব শিগগিরিই এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error

নিউজ টি শেয়ার করুন :)

Instagram
LinkedIn
Share
Follow by Email