নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না সাগরপথের রুট গডফাদাররা ধরা ছোঁয়ার বাইরে; মাদকের ভয়াল আগ্রাসন

জাহিদ রিপন, পটুয়াখালী প্রতিনিধি ॥  আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ অভিযানে একয়দিনে কলাপাড়ায় অন্তত ৩২ জন মাদক সেবন ও সরবরাহকারী গ্রেফতার হলেও ধরা পড়েনি কোন গডফাদার। ফলে পটুয়াখালীর সাগরপাড়ের জনপদ কলাপাড়ায় মাদকের ভয়াল আগ্রাসনে স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীর অভিভাবকরা শঙ্কিত রয়েছেন। ইয়াবা-গাঁজার র্স্ব্গরাজ্যে পরিণত হওয়া কলাপাড়ার শহর কিংবা গ্রাম, এমন কোন জনপদ নেই যেখানে মাদকের ছোবল হানা দেয়নি। মাদকের অর্থ সংগ্রহে বাড়ছে ছিনতাইসহ চাঁদাবাজি।

পুলিশ-র‌্যাবসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর অভিযানে ইতোপুর্বেও ফি মাসে প্রায় অর্ধশত বিক্রেতাসহ সেবনকারী গ্রেফতার হয়। কিন্তু এর নিয়ন্ত্রক গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় মাদকের ছোবল থামছে না। মাদকের ভয়াল গ্রাস রোধে উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় সকল ইউনিয়নের চেয়ারম্যানরা জোরালো বক্তব্য দিচ্ছেন। সড়কের পাশাপাশি বর্তমানে ইয়াবাসহ মাদকের নতুন রুট হচ্ছে সাগরপথ। আলীপুর-মহীপুরে মাছ ধরার ট্রলারে কক্সবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার একটি সংঘবদ্ধচক্র স্থানীয় গডফাদারদের প্রত্যক্ষ শেল্টারে ইয়াবার ব্যবসা চলছে। মাদক নির্মূলে পেশাদার চোলাইমদ উৎপাদনকারী রাখাইনচক্রের মহিলাসহ চারজনকেও পুলিশ গ্রেফতার করে বিপুল পরিমান মদ জব্দ করে। পূর্ণ সফলতা না আসলেও এই অভিযানে সাধারণ মানুষকে কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে।

সম্প্রতি আলীপুর বন্দর থেকে ৩৯৫০ পিস ইয়াবাসহ ফাতেমা আক্তার সানজিদাকে(২৭) পুলিশ গ্রেফতার করার পরে এ তথ্য বেরিয়ে আসছে। ফাতেমার দেয়া তথ্যমতে ইয়াবা পাচারের হোতা চিটাগংএর এক ট্রলার মাঝি আবুল হোসেন। আবুল হোসেন ও ফাতেমার বাড়ি কক্সবাজার হলেও তারা দীর্ঘদিন আলীপুর বন্দরে বসবাস করে আসছে। ফাতেমার স্বামী সৈয়দ হোসেন একজন জেলে । তারা আলীপুরের ব্যবসায়ী পান্না মোল্লার বাড়িতে ভাড়ায় বসবাস করে আসছে।

পুলিশ-র‌্যাবসহ বিভিন্ন সংস্থার হাতে এ পর্যন্ত যারা আটক হয়ে ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে তারা হচ্ছে লতাচাপলীর খাজুরা গ্রামের হাসান ও তার বাবা হাবিব মুন্সী, নয়াকাটা গ্রামের মামুন, আলীপুরের ইয়াবা সম্রাজ্ঞী ফাতেমা, ভাড়াটে হোন্ডাচালক ইউসুফ ও তার বাবা কাশেম মাঝি, মহিপুরের বিপিনপুর গ্রামের ইসমাইল সিকদার, ফুলতলী বাজারের অপু ও সজল, কমরপুরের ইমরান বয়াতী, নজিবপুরের তানভির। কলাপাড়া পৌরসভার রহমতপুরের রিয়ামনি ও আব্দুর রাজ্জাক দম্পতি, কুয়াকাটার শাহীন আলম, বাণিজ্যিক ফটোগ্রাফার নাসির ও আমির ঘরামী, লালুয়ার কলাউপাড়ার মন্নান মুন্সী, হাড়িপাড়ার রাখাইন নিপু, মিঠাগঞ্জের রোজিনা বেগম ও ফেরদৌস দম্পতি, কলাপাড়ার অটোচালক জাহাঙ্গীর, মহিপুরের সুমন হাওলাদার, ধানখালীর মরিচবুনিয়ার ইলিয়াস তালুকদার, চম্পাপুরের রুবেল হাওলাদার, চরচাপলীর জলিল, কলাপাড়া পৌর শহরের মিজান মাস্টার, সোহেল, মিষ্টি, সীমা, ভাড়াটে মোটর সাইকেল চালক মিজান ফরাজী’র স্ত্রী লিজা। মহিপুরের ভাড়াটে মোটর সাইকেল চালক কালু আকন, মহিপুরের জেলেবধূ বধু লায়লা ও জোসনা, মিঠাগঞ্জের মোসাম্মৎ রোজিনা বেগম এবং তার স্বামী ফৈরদৌস এ ব্যবসার সক্রিয় সঙ্গী।

স্থানীয় এসব ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী কিংবা বিক্রেতাদের সঙ্গে উখিয়া টেকনাফের মাদক ব্যবসায়ীদের রয়েছে নিবিড় যোগাযোগ। সম্প্রতি কলাপাড়া পৌরশহরের মুসলিমপাড়া মহল্লায় গোয়েন্দা ও কলাপাড়া থানা পুলিশ যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে ফিরোজ হাওলাদার নামে ইয়াবা ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করে। ২৩০৪ পিস ইয়াবা উদ্ধার হয়। ফিরোজের সহযোগী মোহাম্মদ আলী, আপেল বড়ুয়া, দিলদার মিয়া গ্রেফতার হয়। এদের বাড়ি কক্সবাজার জেলার উখিয়া ও টেকনাফে।

সূত্র জানায়, বেশ কিছু বহিরাগত স্থানীয় গডফাদারদের শেল্টারে কলাপাড়ায় ইয়াবার ব্যবসা করে আসছে। গেল বছর ১৫ আগস্ট সকালে আলীপুরে শেখ রাসেল সেতুর টোলঘরের সামনে থেকে পুলিশ আলমগীর ওরফে জামাই আলমগীরকে ইয়াবাসহ গ্রেফতার করে। ভাড়াটে হোন্ডা চালক হিসেবে পরিচিত আলমগীরের বাড়ি লক্ষ্মীপুরে। আমখোলাপাড়ায় খানাবাদ কলেজ সংলগ্ন এলাকায় বিয়ে করে ইয়াবার ব্যবসা চালাচ্ছে।

ইয়াবা খোররা এখন অনেকে এতোটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে কলাপাড়ায় শেখ কামাল সেতুর সংযোগ সড়ক এলাকায় এরা পর্যটকবাহী বাস, মাছবাহী ও মালবাহী ট্রাকসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন থেকে ফ্রি-স্টাইলে চাঁদা আদায় করছে। এক ইয়াবাসেবী আরিফ ফরাজী বেসামাল হয়ে নিজেই নিজের পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলে। ইয়াবা সম্রাট মিজান মাস্টারকে পুলিশ দুই দফা গ্রেফতর করে। এক ইয়াবা ব্যবসায়ীকে মহিপুর পুলিশ ছেড়ে দিতে রাজি না হওয়ায় ওই পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা দেয়ার হুমকির অভিযোগ আনেন আরেক এক পুলিশ কর্মকর্তা। উপজেলা পরিষদের আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় পুলিশ এসব বলেছেন। নীলগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এ্যাডভোকেট নাসিরউদ্দিন তার ইউনিয়নের কয়েকটি স্পটে গাঁজা-ইয়াবা বিক্রির অভিযোগ তুলে বক্তব্য রাখেন।

থানা পুলিশ জানায়, বার্মা থেকে সাগরপথে আসে মাদক। মোজাহারউদ্দিন বিশ্বাস কলেজের অধক্ষ জানান, তার কলেজের উত্তর-পুর্ব পাশের রাস্তায় গাঁজাখোর ও মাদক সেবীর আড্ডা বসে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার হাবিবুল্লাহ রানা জানান, ঘরে ঘরে মহিলারা গাঁজা বিক্রি করে। তিনি দাবি করেন অন্তত ৩৬ জন মহিলা মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত রয়েছে। কলাপাড়া ও মহিপুর থানার তথ্যমতে ফি মাসে দুই থানায় মাদক নিয়ন্ত্রন আইনে ১৪/১৫টি মামলা হয়। গ্রেফতার হয় গড়ে অন্তত ৩০ জন।

পুলিশের এমন ধারাবাহিক অভিযানে ইয়াবা ব্যবসায়ীসহ সেবনকারী গ্রেফতার হলেও বন্ধ হয় না মাদকের ব্যবসা। বর্তমানে ইয়াবা ব্যবসার দৌরাত্মে শহরসহ কলাপাড়ার গ্রামীণ জনপদেও সাধারণ মানুষ শঙ্কিত। নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়,কলাপাড়া সদর মহিপুর-আলীপুর, কুয়াকাটা, বালিয়াতলী, বানাতিপাড়া, ডালবুগঞ্জ, বাবলাতলা, চাপলী, লক্ষ্মীর বাজার, পাটুয়া, দেবপুর, পায়রা পোর্ট এলাকা, রজপাড়া, নাচনাপাড়া, চৈয়াপাড়া চৌরাস্তা, শেখ কামাল সেতুর সংযোগ সড়ক এলাকা, পাখিমারা বাজার, হাজীপুর স্ট্যান্ড, ছোট বালিয়াতলীসহ অসংখ্য স্পটে ইয়াবা-গাঁজাসহ মাদকের রমরমা বাণিজ্য চলছে। অনেক রাজনৈতিক ক্যাডার আবার এসব ব্যবসার গডফাদার বনে আছেন। রাতারাতি বিত্ত-বৈভবের মালিক হতে এ পথ বেছে নিয়েছেন তারা। তবে পুলিশ-র‌্যাবের খাতায় তাদের রয়েছে তালিকা। তবে নতুন নদী পথের এ রুট বন্ধে ব্যাপক অভিযান চালানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মানুষ।

কলাপাড়া থানার ওসি মো. জাহাঙ্গীর হোসেন এবং মহিপুর থানার ওসি মিজানুর রহমান জানান, মাদক নির্মুলে তাদের চলছে নিত্য অভিযান। যে কোন মূল্যে মাদক ব্যবসা নির্মূল করার দৃঢ়তা ব্যক্ত করলেন এ দুই পুলিশ কর্মকর্তা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error

নিউজ টি শেয়ার করুন :)

Instagram
LinkedIn
Share
Follow by Email