নিলুর স্বামী সুর্দশন বড়–য়াকে নিজ দোকানে আগুন দিয়ে পুড়ে মারা হয় ৯২ সালে চন্দনাইশের নিলু বড়–য়া জীবন যুদ্ধে জয়ী ও সফল নারী

মো. দেলোয়ার হোসেন, চন্দনাইশ: দীর্ঘ ২৫ বছর পর জীবন সংগ্রামে জয়ী নিলু রানী বড়–য়াকে জয়িতা নির্বাচিত করেন চন্দনাইশের মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর। “নির্যাতনের বিবেশিখা মুছে ফেলে, নতুন উদ্যোমে জীবন শুরু করেছেন যে নারী” তিনি হলেন, চন্দনাইশ পৌরসভার নিলু রাণী বড়–য়া। তিনি জেলা পর্যায়েও জয়িতা নির্বাচিত হয়েছেন।
জানা যায়, চন্দনাইশ পৌরসভার হারলা বড়–য়া পাড়ার বিশিষ্ট সমাজ কর্মী, দানবীর সুর্দশন বড়–য়া ঐ এলাকার একজন স্বনামধন্য ব্যক্তি ছিলেন। তার সাথে এলাকার হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, সকল ধর্মের সকল পেশার মানুষের সাথে সুসম্পর্ক ছিল। তিনি এলাকার মানুষকে ভাল কাজের জন্য সুসংগঠিত করতেন। এক বাক্যে তাকে এলাকাবাসী ভাল মানুষ হিসেবে ভালবাসতেন এবং শ্রদ্ধা করতেন। তিনি নিজ ভিটায় দ্বিতল বিশিষ্ট মাটির তৈরি দোকান ঘর করে নিজের সংসার জীবন চালাতেন। তার সংসারে সে সময় স্ত্রী নিলু বড়–য়া (নিরুপমা বড়–য়া), সুশান্ত বড়–য়া (২৫), শিখা বড়–য়া (২২), সুমিতা বড়–য়া (২০), সুব্রত বড়–য়া (১৮), অমিতা বড়–য়া (১৬), বনিতা বড়–য়া (১৪) সহ আট জনের সংসার ছিল। সুখে শান্তিতে ছিল তার সে সংসার। ছেলে-মেয়েরা সবাই অধ্যায়নরত ছিল। ১৯৯২ সালে ২৩ অক্টোবর দিবাগত গভীর রাতে ডাকাত সেজে এলাকার একটি কুচক্রী মহল সুর্দশন বড়–য়ার দোকানে এসে ডাকাডাকি করে। তিনি বিষয়টি বুঝতে পেরে দ্বিতল বিশিষ্ট মাটির তৈরি দোকানের দ্বিতীয় তলায় উঠে যায়। সেখানে থাকা এসিডের বোতল নিয়ে দুষ্কৃতিকারীদের ভয় দেখান। তখন দুষ্কৃতিকারীরা তাকে দোকান ঘরে চারিপাশে কেরোসিন ঢেলে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে মারার হুমকি দেয়। কিন্তু সুর্দশন বড়–য়া তাদের হুমকিকে বিশ্বাস করতে পারেনি। তিনি দোকানের পাশে ঘরে থাকা স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েদের ডাকতে শুরু করেন। এসময় দুষ্কৃতিকারীরা তার ঘরের বাহিরে ছিটকনি দিয়ে তালা লাগিয়ে সবাইকে বসত ঘরে আবদ্ধ করে রাখে। অবশেষে ডাকাত বেশে এলাকার এসকল দুষ্কৃতিকারীরা দোকান ঘরের চালে কেরোসিন দিয়ে আগুন লাগিয়ে দেয়। দোকান ঘরে আগুন লাগার পর আগুনের লেলিহান শিখা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আগুন নিবাতে ছুটে আসতে থাকে। কিন্তু ডাকাতবেশী দুষ্কৃতিকারীরা গুলি করে সাধারণ মানুষকে আতংকিত করে আসতে দেয়নি। ঘন্টাকাল ব্যাপী আগুন জ্বলে দোকান ঘরটি সম্পূর্ণ ভষ্মিভূত হয়। ফলে দোকান ঘরের দ্বিতীয় তলায় আগুনে পুড়ে মারা যায় সুর্দশন বড়–য়া। তার মৃত্যু নিশ্চিত করে দুষ্কৃতিকারীরা পালিয়ে যায়। সকালে সুর্দশন বড়–য়ার লাশ দেখতে গিয়ে সাধারণ মানুষ দেখে একটি মুর্তির মত দেখা যায় সুর্দশন বড়–য়াকে। কথা হয়েছিল চন্দনাইশে জয়িতাদের সংবর্ধনা অনুষ্টানে আসা সুর্দশন বড়–য়ার স্ত্রী নিলু রানী বড়–য়ার সাথে। তিনি এ কথা গুলো বলতে বলতে আবেগে আফলুত হয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলেন। তিনি বলেন, স্বামী হারিয়ে সেদিন মামলা করতে পারিনি। পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করলেও বিএনপি ক্ষমতায় থাকার কারণে দীর্ঘ নয় বছর পর আসামীরা খালাস পেয়ে যায়। হত্যাকারীদের মধ্যে একজন এখন ও তার নাতনিকে দেখে বলে তোর দাদুকে আমি হত্যা করেছি। এ কথা গুলো নাতনি যখন বাসায় এসে বলে তখন তার বুক কান্নায় ফেটে যায়। দীর্ঘ ২৫ বছর নির্যাতনের স্মৃতি বুকে নিয়ে অনেক কষ্টে ৬ ছেলে-মেয়েকে সু-শিক্ষায় শিক্ষিত করে বিবাহ দিয়ে সংসারী করেছেন। মেয়ে শিখা বড়–য়াকে হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারী পাশ করিয়েছেন। সুশান্ত বড়–য়া এসএসসি পাশ করে সংসারী হয়েছেন, সুমিতা বড়–য়া এইচএসসি পড়াকালীন ১ জন ব্যাংক কর্মকর্তা সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়, সুব্রত বড়–য়া পালি বিভাগে ¯œাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করে বর্তমানে সংসদ সদস্য আলহাজ্ব নজরুল ইসলাম চৌধুরীর একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্বরত আছেন, অমিতা বড়–য়া এসএসসি পাশ করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়, বিনিতা বড়–য়া এইচএসসি পাশ করে স্বামীর সাথে হংকং এ বসবাস করছেন। চন্দনাইশে গত বছর জয়িতা নির্বাচনে “নির্যাতনের বিবেশিখা মুছে ফেলে, নতুন উদ্যোমে জীবন শুরু করেছেন যে নারী” এই শৃঙ্খলায় এসেছে নিলু রানী বড়–য়া। তিনি জেলা পর্যায়ে ১৪টি উপজেলায় এ ক্যাটাগরিতে জয়িতা নির্বাচিত হয়েছেন। নিলু রাণী বড়–য়া শত প্রতিকুলতার মাঝেও সংসার জীবনে সফল নারী হিসেবে ৬ ছেলে-মেয়েকে তার সাধ্য মত লেখাপড়া শেষ করে সংসারী করেছেন। তারা সবাই বর্তমানে সুখে শান্তিতে জীবন-যাপন অতিবাহিত করছেন। এটাই তার পরম তৃপ্তি বলে দাবি করেন। তবে তিনি তার স্বামী হত্যার বিচার না পাওয়ার কথা বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তার স্বামীর হত্যাকারীরা এখনো প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং নিজেদেরকে সমাজে ভাল মানুষ হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে এটাই তার দুঃখ বলে তিনি দাবি করেন। এ ব্যাপারে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা গীতা চৌধুরী বলেছেন, নিলু রানী বড়–য়া একজন নির্যাতিত মহিলা। তবে তিনি সাহসী এবং কর্মবীর। তিনি তার সেই নির্যাতনের বিবেশিখাময় ঘটনাকে মুছে ফেলে নিজের ছেলে মেয়েদেরকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ফলে তিনি জেলা পর্যায়ে এ ক্যাটাগরিতে সিলেকশন হয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error

নিউজ টি শেয়ার করুন :)

Instagram
LinkedIn
Share
Follow by Email