চমেকের নীতিমালা আলোকে মরদেহ বহন করবে ২৬ অ্যাম্বুলেন্স চালক

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে মাত্রাতিরিক্ত ভাড়া আদায় করায় রোগী ও মরদেহ পরিবহনে অ্যাম্বুলেন্স চালকদের কাছে জিম্মি ছিলেন স্বজনরা। এ জিম্মিদশা থেকে মুক্তি দিতে নীতিমালার আলোকে ২৬ জন অ্যাম্বুলেন্স ও মরদেহবাহী চালক কাম ব্যবসায়ীকে পরিবহনের অনুমতি দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

আগামী সপ্তাহ থেকে শুধু ২৬টি অ্যাম্বুলেন্স ও মরদেহবাহী গাড়ি চমেক হাসপাতালে ঢুকতে পারবে।

চমেক হাসপাতাল সূত্র জানায়, হাসপাতাল থেকে রোগী ও মরদেহ পরিবহনের নীতিমালা গত ২২ মার্চ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে কার্যকর করা হয়। এ জন্য চালকদের কিছু নির্দিষ্ট শর্ত দেওয়া হয়। শর্ত পূরণ করে মাত্র ২৬ জন। তাদের অ্যাম্বুলেন্স করে রোগী ও মরদেহ পরিবহনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

১৩১৩ শয্যার এ হাসপাতালে প্রতিদিন রোগী ভর্তি থাকে ৩ হাজারের বেশি। বহির্বিভাগে রোগী আসে আরও ৩ হাজার। প্রতিদিন গড়ে ২০-২৫ জন রোগী মারা যায়। এসব মরদেহ ও চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে জমজমাট অ্যাম্বুলেন্স বাণিজ্য চলছিলো।

হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ার এ জবরদস্তি এখন একেবারে কমে যাবে উল্লেখ করে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক ডা. ফয়সাল ইকবাল চৌধুরী বলেন, সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে যে হয়রানির অভিযোগ আসতো তা একেবারে কমে যাবে। নীতিমালায় আসার কারণে কেউ চাইলে বেশি ভাড়া আদায় করতে পারবে না। অভিযোগ পেলে তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হবে।

তিনি জানান, নীতিমালা অনুযায়ী এসব অ্যাম্বুলেন্স সিরিয়াল অনুসারে ভাড়ায় যাওয়া এবং নির্ধারিত ভাড়া আদায় করবে।

রোগীর স্বজনেরা বলছেন, নীতিমালা কার্যকর হলে হয়রানি বন্ধ হবে। নগরের জিইসি মোড় এলাকার বাসিন্দা জসিম উদ্দিন বলেন, আমার বড় ভাইকে অর্থোপেডিক ওয়ার্ডে ভর্তি করিয়েছিলাম। ১০ দিন পর ওয়ার্ড থেকে ছাড়পত্র দেয়। অ্যাম্বুলেন্সে করে বাসায় নিয়ে যাবো কিন্তু চালক দেড় হাজার টাকা ভাড়া দাবি করে।

তিনি জানান, নীতিমালা কার্যকর না থাকার কারণে অতিরিক্ত টাকা আদায় করছে।

শর্ত পূরণ করে অনুমতি পাওয়া ২৬ অ্যাম্বুলেন্স ও মরদেহবাহী গাড়িগুলো হলো- মো. আকতারুজ্জামান নামে একজন মালিকের চট্ট-মেট্রো-ছ-৭১-০১৩৩, চট্ট-মেট্রো-ছ-৭১-০১১০, চট্ট-মেট্রো-ছ-৭১০১৩৩ সিরিয়ালের এ তিনটি গাড়ি, মো. বশির নামে একজনের চট্ট-মেট্রো-ছ-৭১-০১৩৮, মো. সোলায়মান নামে একজনের চট্ট-মেট্রো-ছ-৭১০২২১ সিরিয়ালে দুটি গাড়ি, মো. আব্দুস সামাদ তরফদার নামে একজনের চট্ট-মেট্রো-শ-৭১-০৭২৭, মো. জামাল উদ্দিন নামে একজনের চট্ট-মেট্রো-ছ-৭১-০১১৫ ও মো. মোরশেদ উর রহমানের চট্ট-মেট্রো-ছ-৭১-০০২১ সিরিয়ালের গাড়ি।

এছাড়াও মো. জামাল উদ্দিনের চট্ট-মেট্রো-ছ-৭১-০৩৬৭, মো. আলমগীরের চট্ট-মেট্রো-ছ-৭১-০২২৭, উত্তম পালের চট্ট-মেট্রো-১১-০৫৫৭ ও চট্ট-মেট্রো-ছ-৭১-০২২২ সিরিয়ালের দুটি গাড়ি, মো. আমানত উল্লাহর চট্ট-মেট্রো-ছ-৭১-০২৬৭, মো. আব্দুস সামাদ তরফদারের চট্ট-মেট্রো-ছ-৭১-০১২৫, রুবেল দাশের চট্ট-মেট্রো-ছ-৭১-০২৪০, মো. ওয়াজেদুর রহমানের চট্ট-মেট্রো-শ-১১-০৫৭০, কক্সবাজার ছ-৭১-০০১৬ সিরিয়ালের দুটি গাড়ি ও মো. মনির হোসেন রাজুর চট্ট-মেট্রো-ছ-১১১৮৭০ সিরিয়ালসহ মোট ১৯টি গাড়ি।

আরও ৭টি গাড়ির কাগজপত্র ঠিক আছে যেগুলো পরে যোগ করা হবে বলে জানান চমেক হাসপাতালের উপ পরিচালক ডা. আখতারুল ইসলাম।

নীতিমালায় যা থাকছে: চমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মরদেহবাহী গাড়ি নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি কক্ষ চালু রাখবে। দায়িত্ব পালন করবেন হাসপাতালের একজন কর্মচারী। মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সগুলোর তালিকা ও প্রয়োজনীয় তথ্যাদি নিয়ন্ত্রণ কক্ষে লিপিবদ্ধ থাকবে।

এ ছাড়াও গাড়িগুলো নির্দিষ্ট জায়গায় পার্কিং ও সর্বোচ্চ পাঁচটি গাড়ি পার্কিংয়ে অবস্থান করতে পারবে। অপেক্ষমাণ গাড়িগুলো সিরিয়াল অনুযায়ী ভাড়া পাবে।

নীতিমালায় ৩ ক্যাটাগরিতে নন-এসি, এসি ও ফ্রিজার ভ্যানের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। আসা-যাওয়া মিলে ১০ কিমি নন এসি ছোট ও বড় অ্যাম্বুল্যান্স ভাড়া ৮০০ টাকা, এসি ও ফ্রিজার ভ্যান ৯০০ টাকা। ২০ কিমিতে নন এসি ছোট ও বড় এক হাজার ২০০ টাকা, এসি ও ফ্রিজার ১ হাজার ৩০০ টাকা। ৩০ কিমিতে নন এসি ছোট ও বড় ১ হাজার ৮০০ টাকা, এসি ও ফ্রিজার ভ্যান ১ হাজার ৯০০ টাকা। বিমানবন্দর পর্যন্ত ৪৫ কিমিতে নন এসি ছোট ও বড় ২ হাজার ২০০ টাকা এবং এসি ও ফ্রিজার ভ্যান ২ হাজার ৫০০ টাকা।

আন্তঃনগরে নন এসি ছোট গাড়ি (১৮০০ সিসির নিচে) ১ হাজার ৫০০ টাকা স্থির খরচের সঙ্গে প্রতি কিমিতে ১৪ টাকা। বড় গাড়ি (১৮০০ সিসি ও তার চেয়ে বেশি) ১ হাজার ৫০০ টাকা স্থির খরচের সঙ্গে প্রতি কিমিতে ১৭ টাকা। এসি ও ফ্রিজার ভ্যান ১ হাজার ৫০০ টাকা স্থির খরচের সঙ্গে প্রতি কিমিতে ১৯ টাকা। পাহাড়ি অঞ্চলে প্রতি কিমিতে ১০ শতাংশ বেশি। ফ্রিজার ভ্যানের ওয়েটিং চার্জ গন্তব্যে পৌঁছার পর প্রথম ঘণ্টা ফ্রি। এরপর গ্রাহকের বিদ্যুৎ ব্যবহারে প্রতি ঘণ্টায় ৩০০, পরিবহনের বিদ্যুৎ ব্যবহারে প্রতিঘণ্টা ৩৫০ টাকা। অক্সিজেনের জন্য নতুন সিলিন্ডার প্রতি ২২০ টাকা গ্রাহককে দিতে হবে।

চমেক হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আখতারুল ইসলাম বলেন, নীতিমালা অনুসারে আমরা অ্যাম্বুলেন্স চালক কাম ব্যবসায়ীদের নির্দিষ্ট শর্ত দেই। শর্ত পূরণ করেছে ২৬ জন। আরও যারা শর্ত পূরণ করবে তাদের মরদেহ বহন করার অনুমতি দেওয়া হবে। আশা করছি আগামী সপ্তাহ থেকে নীতিমালা আলোকে এই ২৬জন অ্যাম্বুলেন্স চালক মরদেহ বহন করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error

নিউজ টি শেয়ার করুন :)

Instagram
LinkedIn
Share
Follow by Email