চকরিয়া-পেকুয়ায় পাহাড়ে বসবাসকারীদের অন্যত্র সরে যাওয়ার প্রশাসনের নির্দেশ

টানা কয়েকদিনের বৃষ্টিতে পাহাড় ও মাটি ধসের আশংকায় কক্সবাজারের চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলায় পাহাড়ে বসবাসকারীদের অন্যত্র সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। আজ সোমবার পাহাড়ে বসবাসকারীদের সরিয়ে নিতে বনবিভাগের কর্মকর্তা ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানদের নির্দেশনা দেওয়া হয়।

কক্সবাজারে এ দুটি উপজেলায় পাহাড়ে বসবাসকারী প্রায় ১৫ হাজার মানুষ মৃত্যু ঝুঁকিতে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে দরিদ্র শ্রেণির বিশাল একটি গোষ্ঠী পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করে আসলেও তাদের সরিয়ে নিতে বা পুনর্বাসনের কোন ব্যবস্থা করেনি কেউ। ফলে চলতি বর্ষা মৌসুমে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশংকা করছে সচেতন মহল।

মরতুজা বেগম (৩২) নামে এক গৃহিনী, দিনমজুর স্বামী ওয়াহিদুল ইসলাম ও দুই সন্তান নিয়ে পেকুয়া উপজেলার টইটং ইউনিয়নের আধার মানিক নামে পাহাড়ি এলাকায় তার বসবাস। স্বামীর আয়ে চলতি বছরের শুরুর দিকে বাঁশের বেড়া ও টিন দিয়ে নির্মাণ করেছিলেন নতুন ঘর। কিন্তু কয়েকদিনের টানা বর্ষণের কারণে আঁধার নেমে আসে তার জীবনে। পাহাড় ধসে নিমিষেই মাটিচাপা পড়ে তার সুন্দর সাজানো ঘর। এ সময় ভাগ্যক্রমে প্রাণে বাঁচলেও আহত হন মরতুজা।

পরে পাহাড় ধসে বিধ্বস্ত বসতবাড়ি থেকে স্থানীয়দের সাহায্যে উদ্ধার হয়ে তিনি আশ্রয় নিয়েছেন শিলখালী ইউনিয়নের মাঝের ঘোনা এলাকার বাবার বাড়িতে। কিন্তু বাবার বাড়ি কতটা ঝুঁকিমুক্ত তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দিহান মরতুজা। কারণ তার বাবার বাড়িও পাহাড়ের পাদদেশে নির্মিত। তাই পুরো পরিবার নিয়ে চরম আতঙ্কে রয়েছে মরতুজা। ঝুঁকিতে রয়েছে একই বাড়িতে বসবাসকারী তার আরও দশ নিকটাত্মীয়। এভাবেই তিনি এ শঙ্কার কথা জানান।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বিশাল একটি গোষ্ঠী পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করে আসলেও তাদের সরিয়ে নিতে বা পুনর্বাসন করতে উদ্যোগী নয় স্থানীয় প্রশাসন। তাই বড় ধরনের কোন দুর্ঘটনা ঘটলে, এর দায় এড়াতে পারবেন না তারা। এমনকি এই প্রবল বর্ষণে পাহাড় ধসের আশংকা থাকা সত্ত্বেও তাদের সরিয়ে নিতে কোন প্রকার উদ্যোগ বা বসবাসকারীরা সরে যেতে সচেতনতা তৈরি করা হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পেকুয়া উপজেলার টইটং ইউনিয়নের সংগ্রামের জুম, বটতলীর গহীন অরণ্য মধুখালী, হারখিলারঝিরা, আধার মানিক, পূর্ব ধনিয়াকাটা, বারবাকিয়া ইউনিয়নের আবাদি ঘোনা, পূর্ব পাহাড়িয়াখালী, চাকমার ডুরি, ছনখোলার জুম ও শিলখালী ইউনিয়নের জারুরবুনিয়া, সাপের গাড়া, মাদাবুনিয়া, মাঝের ঘোনা, চিতার ঝিরি, নাপিতার ঘোনা, সবুজ পাড়া, ঢালার মুখ, পূর্ব শিলখালীতে অন্তত ৫ হাজার মানুষ ও চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের মছন্যাকাটা, বানিয়ারছড়া, মাহমুদনগর, পাহাড়তলী, ভিলেজার পাড়া, হারবাং ইউনিয়নের মুসলিমপাড়া, শান্তিনগর, ফইজ্যার ডেবা, কৈয়ারবিল ইউনিয়নের ইসলামনগর, সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়নের উত্তর মানিকপুর, খুটাখালী ইউনিয়নের মেধাকচ্ছপিয়া নয়াপাড়া, কাকারা ইউনিয়নের বার আউলিয়া নগর, শাহ ওমরনগর ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের নয়াপাড়া, ছগিরশাহকাটা, ছায়েরা খালী, ডুলাহাজারা ও বমু বিলছড়ি ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকায় অন্তত ১০ হাজার মানুষ চরম ঝুঁকিতে বসবাস করছে। গত এক যুগ ধরে এসব মানুষ পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করছেন।

কক্সবাজারের উত্তর বন-বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা হক মাহবুব মোরশেদ বলেন, ‘চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলায় পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারীদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তালিকাটি ইতিমধ্যে উপজেলা প্রশাসনকে দেওয়া হয়েছে। পাহাড় ধসের ঝুঁকি থেকে এসব পরিবারকে উচ্ছেদে প্রশাসন উদ্যোগ নিলে বনবিভাগের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হবে।’

সুরাজপুর-মানিকপুর ইউপি চেয়ারম্যান আজিমুল হক জানান, পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত বেশিরভাগ লোক দরিদ্র শ্রেণির। তারা অভাব-অনটনে জর্জরিত হয়ে ও নদী ভাঙনের শিকার হয়ে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ে বসবাস করছে। তারপরও তাদের জীবন বাঁচাতে পাহাড় থেকে সরে এসে আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়ার জন্য বলা হয়েছে।

বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জালাল উদ্দিন জানান, তার এলাকার ৫০ শতাংশ লোক পাহাড়ে বসবাস করে। এরমধ্যে যেসব এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ সেসব এলাকার লোকজনকে সরে আসার জন্য বলা হয়েছে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট এলাকার মেম্বারদের সার্বক্ষণিক নজর রাখার জন্য বলা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গেও এ ব্যাপারে সার্বক্ষণিক যোগযোগ রয়েছে। তিনি বিভিন্ন ধরনের নির্দেশনা দিচ্ছেন।

পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব-উল করিম বলেন, ‘পাহাড়ে অতি ঝুঁকিপূর্ণভাবে যারা বসবাস করছে তাদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য বনবিভাগের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বনবিভাগ এই ব্যাপারে কাজ করছে।’

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুদ্দীন মুহাম্মদ শিবলী নোমান বলেন, ‘যেসব ইউনিয়নে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস রয়েছে, সেসব ইউপি চেয়ারম্যানদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

এ ব্যাপারে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে বলেও জানান ওই নির্বাহী কর্মকর্তা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error

নিউজ টি শেয়ার করুন :)

Instagram
LinkedIn
Share
Follow by Email