করোনাকে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে, বিকল্প অনেক দেরী

শাহনেওয়াজ শাহীদ

এত কথা না বলে একদম সাধারণ বোধগম্য ভাষায় জ্ঞানের আলাপ শুরু করি। ভ্যাক্সিন জিনিসটিকে আপনি শিক্ষকের মত ভাবতে পারেন। বিষয়টি এমন যে, যখন কোনো ভাইরাস ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করে, ভাইরাস না মুলত প্যাথোজেন (প্যাথোজেনের মধ্যে ভাইরাস,ব্যকটেরিয়া, প্রোটজোয়া সব ধরনের অনুজীব আছে,যা ব্যক্তির শরীরের ক্ষতি করে) তো যখন প্যাথোজেন আমাদের শরীরে প্রবেশ করে তখন মানবদেহের ইমুনিটি সিস্টেম তিন ধরনের কাজ করে।

প্রথমত প্যাথোজেন শনাক্ত করা। অর্থ্যাৎ কোন ভাইরাস দেহে প্রবেশ করেছে, তার বৈশিষ্ট্য কি, কি করছে ইত্যাদি। দ্বিতীয়ত এই প্যাথোজেনগুলোকে দেহ থেকে বিতাড়িত করা। সাধারণ ভাষায় প্যাথোজেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। যা আমাদের শরীরের শ্বেত রক্ত কনিকা করে থাকে। শ্বেত রক্তকনিকাকে দেহের ব্যক্তিগত আর্মির ন্যায়ও কল্পনা করা যায়। আর যখন এমন হয় তখনই আমাদের দেহে লক্ষনের প্রকাশ পায়। যেমন জ্বর, স্বর্দি, কাশি প্রভৃতি। এই সকল প্রকাশ করে যে, আমাদের দেহে ভিন্ন কিছু প্রবেশ করেছে এবং শ্বেত রক্তকনিকা তার বিরুদ্ধে লড়ছে। আর শ্বেত রক্তকনিকা এন্টিবডি তৈরি করছে প্যথোজেনের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য।

তৃতীয় কাজ হচ্ছে স্মৃতিচারন করা। অর্থ্যাৎ একবার কোনো প্যাথোজেন দেহে প্রবেশ করেছিল এবং তাদের কোন কোন পদ্ধতিতে লড়াই করা হয়েছিল। যেন আগামীবার সেই প্যাথোজেন ফিরে আসলে একই পদ্ধতিতে লড়াই করতে হবে এবং তাকে শেষ করতে পারে।

এখন ভ্যাক্সিন আমাদের দেহকে শিক্ষকের মত পরীক্ষা কিংবা লড়াইয়ের আগে পূর্ব শিক্ষা দেয় যে, দেখো যদি অমুক প্যাথোজেন দেহে প্রবেশ করে তবে তুমি এভাবে করে তাকে তাড়াবে, দেহে প্রবেশ করতে দিবে না। মানে প্রথম থেকেই স্মৃতিচারন করে রাখো কোন প্যাথোজেন আসলে কি প্রতিক্রিয়া দিতে হবে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে ভ্যাক্সিনে এমন কি থাকে যে তা আমাদের শরীরকে এভাবে যুদ্ধের জন্য তৈরী করে?
উত্তরটি অতিসাধারণ। ভ্যাক্সিনে বেশির ভাগ সময়ে সেই প্যাথোজেনটি অর্থ্যাৎ ক্ষতিকারক ভাইরাসটিই অবস্থান করে কিন্তু তা ভিন্ন ভিন্ন অবস্থায়। কিছু ভ্যাক্সিনে প্যাথোজেনটিকে হত্যা করে তার ডেডবডি রাখা হয়, কিছু ভ্যাক্সিনে প্যথোজেনটিকে দূর্বল করে রাখা হয়, কিছু ভ্যাক্সিনে প্যাথোজেনকে কেটে ভাগ করে কিছু অংশ রাখা হয়। এছাড়া আরো বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। কিন্তু সাধারণত এই তিন ধরনের পদ্ধতির বেশি দেখা মিলে।

যদি কোনো ভ্যাক্সিনে প্যাথোজেনকে দূর্বল করে রাখা হয় তবে তাকে বলা হয় “লাইফ এটেন্ডুয়েটেড ভ্যাক্সিন”। চিকেন পক্স, স্মল পক্সে এধরণের ভ্যক্সিনের ব্যবহার হয়। যদি কোনো ভ্যাক্সিনে প্যাথোজেনকে নিষ্ক্রিয় করে (হত্যা করে) রাখা হয় তবে তাকে “ইনএক্টিভেটেড ভ্যাক্সিন” বলে। ফ্লু, পলিও, রেবিসে এই ধরনের ভ্যাক্সিনের ব্যবহার হয়।
আর যদি কোনো ভ্যাক্সিনে প্যাথোজেনের বিভিন্ন টুকরো করে বা যুক্ত করে ভ্যাক্সিন তৈরী করা হয় তবে তাকে “সাব-উনিট ভ্যাক্সিন” বলে। হেপাটাইটিস-বি, এইচপিভি ইত্যাদিতে ব্যবহার হয়।

ভ্যাক্সিন কেন?

ভ্যাক্সিন পৃথিবীতে যত জীবন রক্ষা করেছে, বিশ্বে আর কোনো প্রযুক্তি তা করতে পারেনি। আজ থেকে ২’শ- আড়াইশ বছর পূর্বে যখন ভ্যাক্সিন প্রযুক্তি ছিল না তখন ৫ বছরের কমের শিশুর মৃত্যুর হার ছিল ৪৫ভাগ থেকে ৫০ভাগ। যা সেই সকল রোগের ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের পর আজকের দিনে ১% এরও অনেক কমে এসে দাড়িয়েছে।

একটি ভ্যাক্সিন তৈরী করতে কত সময় লাগতে পারে?

সাধারণত গড়ে ১০ বছর। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে কোভিড-১৯ এর সময়ে যে দ্রুততার সাথে কাজ চলছে, এভাবে চলতে থাকলে এক থেকে দেড় বছরের মধ্যেই ভ্যাক্সিন বাজারে পাওয়া সম্ভব। এখন পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুততম ভ্যাক্সিন হচ্ছে “মামস” এর ভ্যাক্সিন যা তৈরী করতে চার বছর লেগেছে। অন্যদিকে এইচআইভি এইডস এর ভ্যাক্সিন যা এখনো ৪০ বছর যাবৎ আবিষ্কৃত হয়নি।

ভ্যাক্সিন তৈরীর ধাপ কয়টি?

সাধারণত তিন ধরনের ধাপ হয়ে থাকে। প্রথমত বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে নিশ্চিত হন তাদের কোন পদ্ধতিতে ভ্যাক্সিন তৈরী করতে হবে। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, লাইফ এটেন্ডুয়েটেড নাকি অন্যকোনো বিশেষ পদ্ধতিতে।

দ্বিতীয়তে আসে টেস্টিং। এখানেও আবার অনেক ধাপ আছে। প্রথমে প্রি-ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল অর্থ্যাৎ বিভিন্ন কোষ ও পশুর উপর ভ্যাক্সিন টেস্ট। তারপর মানবদেহে টেস্ট করা হয় যাকে বলা হয় ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল। সেখানেও তিন থেকে চারটি ধাপ। প্রথমে কয়েকজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির উপর টেস্ট করা হয় কিছু দিনের জন্য। সেটি সফল হলে দ্বিতীয় ধাপে আনুমানিক একশ-দুইশ মানুষের উপর ট্রায়াল হয় কিছু মাসের জন্য। তৃতীয় ধাপে হাজারো মানুষের উপর এটি টেস্ট করা হয় এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষন করা হয়।

এরপর তৃতীয় ধাপে আসে স্বীকৃতি ও বাজারজাতকরণ। এটিও অনেক সময় সাপেক্ষ কারণ কাচামাল সংগ্রহ, ভ্যাক্সিন তৈরীর পরিবেশসহ আরো অনেক কিছু।

কোভিড-১৯ এর ভ্যাক্সিনের বর্তমান অবস্থান কি?

এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে একশরো বেশী ভ্যাক্সিন আছে যা প্রি-ক্লিনিক্যাল ধাপে আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এর মধ্যে প্রায় সত্তরটি ভ্যাক্সিনের তদারকি করছে। যার মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তৈরিকৃত ভ্যাক্সিন। যার দ্বিতীয় ধাপের ট্রায়াল শেষ এবং তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল ২৮ জুন শুরু হয়ে গিয়েছে ব্রাজিলে, যেখানে ৫ হাজার লোকের উপর এই ট্রায়াল চলছে। তাদের ধারণা আগষ্টের শেষের দিকে তারা নিশ্চিত হতে পারবে ভ্যাক্সিন কার্যকর কি না। এবং তারা যদি সফলও হয় তবেও দুই হাজার একুশ সালের প্রথম দিকে এটি বাজারে আসতে শুরু করবে।

সুতরাং জ্ঞানের আলোচনার পর এটি নিশ্চিত যে, ভ্যাক্সিনের আশায় না থেকে সুরক্ষার সাথে সচেতন হয়ে এইডস এর মত করোনাকে সাথে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে।

লেখকঃ শিক্ষার্থী, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error

নিউজ টি শেয়ার করুন :)

Instagram
LinkedIn
Share
Follow by Email