কক্সবাজারে বিভিন্ন কর্মসূচীর মধ্য দিয়ে পালিত হল মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস

মোঃ নাজমুল সাঈদ সোহেল কক্সবাজার প্রতিনিধি: কক্সবাজারে মাদক বিরোধী আন্তর্জাতিক দিবসটি পালন করেছেন বিভিন্ন কর্মসূচীর মধ্যদিয়ে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ও জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর।

মাদকের কথা যদি বলতে হয়, তাহলে কবে থেকে মাদকের ব্যবহার শুরু হয়েছিলো তার সঠিক কোন হিসেব কারও কাছে নেই। চিকিৎসা বিজ্ঞানের হিসাব থেকে যে তথ্য পাওয়া যায় তাতে বলা হয়েছে যে, খ্রীষ্ট জন্মের ১০ হাজার বছর পূর্বে মাদকের ব্যবহার হয়ে এসেছে। ৪ হাজার বছর আগে ভারতবর্ষে মদ, গাঁজা, তাড়ী ভাং ইত্যাদির ব্যবহার হতো এবং এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিলো খুবই কম।

মদ, গাঁজা তাড়ী সেই প্রাচীন কাল থেকে ব্যবহার হয়ে আসছে। আর সেই প্রাচীনকালের তিনটি মাদক বংশবিস্তার করতে করতে আরও অর্ধশত মাদকের জন্ম দিয়েছে। মাদকের প্রতি আকৃষ্ট করেছে কোটি কোটি মানুষকে। সময় কাল ও যুগের আবর্তণে এই মাদকই ভিন্ন ভিন্ন নামে উপস্থিত হচ্ছে মানুষের সামনে। আর সেই নতুনভাবে নতুন নামে উপস্থিত হওয়া মাদকে আকৃষ্ট হয়ে ঝরে যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ তরুণ প্রাণ। একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে যুবসমাজের ওপর! তরুণ সমাজের ওপর! আর এই তরুণ সমাজই যদি বিপথে চলে যায়, তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে মাদকদ্রব্য শুধু ব্যক্তির নয়, একটি সমাজ, একটি জাতির এবং একটি দেশের বিশাল ক্ষতি সাধন করে থাকে। তাই আজ বিশ্বের প্রতিটি দেশে মাদকাসক্তি একটি বৃহৎ ও জটিল সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর সমাধানে বিভিন্ন কার্যক্রম গুরুত্ব পাচ্ছে।

মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার বিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস ২৬ জুন। ইতিপূর্বে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর জনসচেতনতা বৃদ্ধিকরণ লক্ষে গত তিনদিন আগে থেকে নানা কর্মসূচী হাতে নিয়েছেন।

গৃহীত অনুষ্ঠান সূচীর মধ্যে রয়েছে,২৬ জুন (মঙ্গলবার) সকাল দশটায় বিয়াম ফাউন্ডেশন আঞ্চলিক কেন্দ্র থেকে মাদক বিরোধী বর্ণাঢ্য র্যালী, সাড়ে দশটায় বিয়াম ফাউন্ডেশনে আলোচনা সভা, ১১টায় মাদক বিরোধী মানববন্ধন, ১২ টায় রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং পুরস্কার বিতরণ ইত্যাদি।

এতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন কার্যালয়ের কক্সবাজার’র সহকারী পরিচালক সৌমেন মন্ডলের সঞ্চালনায় প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্হিত ছিলেন জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন ও সভাপতিত্ব করেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট মোহাম্মদ আশরাফুল আবসার।উক্ত অনুষ্টানে সমূহে বিশেষ অতিথি হিসাবে পুলিশ সুপার ডঃ একেএম ইকবাল হোসেন, ৩৪
বিজিবি অধিনায়ক লেঃ কর্ণেল মনজুরুল হাসান খান,সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ আবদুস সালাম ও জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি এডভোকেটসিরাজুল মোস্তফা উপস্হিত ছিলেন।

সোসাইটি ফর এন্টি এডিকশন মুভমেন্ট সম্পাদক ডা: এম এ বাকী মাদক বিরোধী অভিযান সম্পর্কে বলেন চলতি বছর মে মাস থেকে সরকারের পক্ষ থেকে যে মাদক বিরোধী কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে এই কর্মসূচিকে আমি সাধুবাদ জানাই। ভবিষ্যতেও এ ধরনের কর্মসূচি বহাল থাকলে মাদকের ব্যাবহার কমে আসবে। পুরোনো মাদকাসক্তদের বিরাট একটি অংশ মাদক সেবন ছেড়ে দিয়ে স্বাভাবিক জিবনে ফিরে আসবে। আবার নতুন করে মাদকের পথে পা বাড়াবে না তরুণ যুবকেরা। মাদক বিরোধী অভিযান শুরুর পর থেকে বিভিন্ন যায়গা থেকে শতাধিক ফোন এসেছে। ভালো রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারের সন্ধানে। মাদকাসক্তি চিকিৎসা পূণর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তি করাতে ইচ্ছুক অনেক মাদকাসক্ত সন্তানের অভিভাবক। অনেক অভিভাবকই জানতেন যে তার সন্তান মাদকাসক্ত, সময় হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। বা বুদ্ধি হলে স্বাধাবিক হয়ে যাবে এই চিন্তা থেকে অনেক পরিবার থেকে তেমন ব্যবস্থা নেয়া হতো না। অনেক পরিবার ছিলো সন্তানের বেপরোয়া আচারণের কাছে নিরুপায় হয়ে করার কিছু ছিলোনা। কিন্তু মাদক বিরোধী অভিযান শুরুর পর যেমন সতর্ক হয়েছে মাদকসেবিরা তেমনি সতর্ক হয়েছে মাদকাসক্তের পরিবার। চিহ্নিত মাদক ব্যাবসায়িরা তো এলাকা ছেড়ে অন্য নিরুদ্দেশ হয়েছে। মাদকের ব্যাবহার কমিয়ে আনতে হলে মাদকের বিরুদ্ধে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর এই কঠোর কর্মসূচি দীর্ঘদিন বহাল রাখতে হবে।

তিনি আরো বলেন, “মাদক নয় চাই প্রাণবন্ত তারুণ্য ” তারুণ্যে আকাশসম স্বপ্ন থাকবে, সীমাহীন খুশি থাকবে, ছোটদের জন্য স্নেহ থাকবে, বড়দের জন্য শ্রদ্ধা থাকবে, আর বন্ধুদের জন্য থাকবে ভালোবাসা। দেশ দশ এবং নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকবে, থাকবে প্রাণচ্ছল! আমি সে তারুণ্যের কথা বলছি। যে তারুণ্য দেশকে উচ্চ থেকে উন্নয়নের উচ্চশিখরে নিয়ে যাবে, দেশের ব্যবসা-বানিজ্য, শিক্ষা-চিকিৎসা স্বাস্থ্য, অর্থনীতির চাকা ঘুরানোর দায়িত্ব নিবে আমি সেই তারুণ্যের কথা বলছি। যে তারুণ্য দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য, স্মৃতি কথা ও স্বরণীয় বরণীয়দের আদর্শ বুকে নিয়ে তাদের স্বপ্ন চোখে নিয়ে এগিয়ে যাবে আমি সেই তারুণ্যের কথা বলছি। কিন্তু এই তারুণ্য এখন খুবই দূর্লভ। তরুণ তুমি কেনো মাদকের কবলে পড়বে? কিসের আশায় কোন হতাশায়? কি নেই তোমার? একটি স্বাধীন দেশ আছে, পতাকা আছে, গর্ব করে বলার মতো ভাষা আছে, বিশ্ব নেতা ও কবি আছে, ছবির মতো দেশ আছে। তোমার হতাশা দুর করার জন্য নদী আছে, পাহাড় আছে, সাগর আছে, সুন্দরবন আছে, এবং শত শত জলপ্রপাত আছে, ছয়টি ঋতু আছে, হাজার লেখকের লেখা বই আছে, তাহলে কোন হতাশায় কিসের আশায় মাদকের কবলে পড়া? কেনো নিজের জীবনে সর্বনাশ ডেকে আনা?এজন্য প্রয়োজন ভালোমানের মাদকাসক্ত পূণর্বাসন কেন্দ্রে! আমাদের ১৪৭৫৭০ বর্গকিলোমিটারের এই দেশে ১৬ কোটি ২০ লাখ মানুষের বসবাস, এর মধ্যে চার কোটি শিশু, বাকি ১২ কোটির মধ্যে ৮০ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত। সেই হিসেবে পূর্ণবয়স্কদের মধ্যে প্রতি ১৪ জনে একজন মাদকাসক্ত। অথচ চিকিৎসা পূণর্বাসনের বেহাল দশা। সরকারি ভাবে সারা দেশে ১২শ থেকে ১৫শ মানুষ এক সাথে চিকিৎসা নিতে পারবে সেটাও আবার দীর্ঘমেয়াদি। বেসরকারি চিকিৎসা পূনর্বাসন কেন্দ্রর গুলোর মধ্যে অধিকাংশই গড়ে উঠেছে বানিজ্যিক কেন্দ্রিক। হাত বাড়ালে মাদক মিললেই সহজে মেলেনা ভালো মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের সন্ধান। মাদক নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর কর্তৃক অনুমোদিত ১৮৮ টি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে সারা দেশে থাকলে, সবগুলোর চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নতমানের না। বা একজন মাদকাসক্তকে সুস্থ্য করতে যথেষ্ট না। আবার এই ১৮৮ টির বাইরেও আছে অনেক মাদকাসক্ত পূণর্বাসন কেন্দ্রে। সন্তান মাদকাসক্ত হলে পরিবারের অন্যরা চিন্তিত তাকে স্বাভাবিক জিবনে ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু চিন্তাটা আরও বেড়ে যায় ভালো নিরাময় কেন্দ্রের সন্ধান না পেয়ে।

মাদক বিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে জেলার অন্যান্য উপজেলায় যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালিত হয়েছে।

এদিকে চকরিয়ায় উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে ‘মাদকবিরোধী গণসচেতনতার লক্ষ্যে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস অনুষ্ঠিত হয়েছে।দিবসটিকে ঘিরে এক বর্ণাঢ্য র‌্যালি ও আলোচনা সভা মঙ্গলবার(২৬জুন) সকাল সাড়ে ১০টায় চকরিয়া উপজেলা পরিষদের হলরুম মোহনা মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error

নিউজ টি শেয়ার করুন :)

Instagram
LinkedIn
Share
Follow by Email