উদ্ধার তৎপরতা জরুরি

নাবিলা ইবনাদঃ

আমাদের সমাজে ‘প্রত্যাশা’ কেবল একটি শব্দ নয়। এটি অনেক বড় অর্থ বহন করে। প্রত্যাশা আমরা অনেকেই অনেকের কাছে করি। তার প্রাপ্তি কতটুকু দিন শেষে সেই হিসেব কষি।

সমাজ মূলত এমন এক ব্যবস্থা বোঝায়, যেখানে একাধিক চরিত্র একত্রে কিছু নিয়ম-কানুন প্রতিষ্ঠা করে একত্রে বসবাসের উপযোগী পরিবেশ গড়ে তোলে। নিয়ম-কানুন যেগুলো মানুষের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি। যে সমাজ সুযোগ করে দেয় আপনাকে বিকশিত করার, সামনে এগিয়ে যাওয়ার।

কয়েকটি পরিবার মিলে গড়ে উঠে একটি সমাজ। মা, বাবা, ভাই,,বোন, দাদা, দাদি, চাচা, চাচী, ইত্যাদি নিয়ে পরিবার। ছোটবেলায় পরিবারের সঙ্গায়িত রূপ আমরা অনেকেই পড়ে এসেছি। যৌথ পরিবার কিংবা ছোট পরিবার যাই বলা হোক না কেন তা সমাজের একটি আনুষঙ্গিক অংশ।

প্রত্যাশা বিষয়টা আমাদের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমরা যেন আমাদের চেতনায়, অবচেতনায় এই শব্দটায় বাঁধা পড়ে আছি। প্রত্যাশা হরেক ধরনের হয়। যেমন: সন্তানের প্রতি বাবা মায়ের, বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের, ভাইয়ের কাছে বা বোনের কাছে, প্রিয় মানুষটির কাছে।

বর্তমান সমাজের দৌড়ে প্রত্যাশা শব্দটি অনেকসময় অভিশাপ স্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটা বাবা-মা’ই চায় তাদের সন্তান প্রতিষ্ঠিত হউক। এমন পর্যায়ে পৌছাক যেন জীবন নিরাপদ হয়। সন্তানরাও চায় বাবা-মা তাদের স্বপ্নটা বুঝুক তাদের উপর যেন কোনো বাড়তি চাপ না দেয়।

এখনকার দিনে সফলতার মাপকাঠি হলো গৎবাঁধা কিছু শব্দ। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল এসব ছাপিয়ে জায়গা করে নিয়েছে বিসিএস নামক শব্দটি। প্রতিটা বাবা মা’ই চায় তাদের সন্তান উঁচু পর্যায়ে পৌছাক। এই চাওয়াটা অনেকসময় সন্তানদের উপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করে দেয়। ভালো স্কুল,কলেজে ভর্তির পর যে জিনিসটা আমাদের দেশে ছেলে মেয়েদের ভবিষ্যৎ মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হয় তা হলো “পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়” ভর্তি। আর ক্যারিয়ারের উচ্চ আসনে বিসিএস।

প্রত্যেকটি মানুষের নিজস্ব একটি স্বপ্ন আছে। আমার স্বপ্ন ইচ্ছে আমার কাছে যেমন মূল্যবান অপরের কাছে তা নাও ভালোলাগতে পারে। তবে উচিত প্রতিটা মানুষের স্বপ্নের সঠিক মূল্যায়ন করা। পথ দেখানো বা উৎসাহ দেয়া। এ জিনিসের স্বল্পতায় বেশি আমাদের সমাজে।

চাকরি করতে হবে এটা সকলকেই শিখানো হচ্ছে ছোট বেলা থেকেই। অথচ জীবনের যতগুলো বছর একজন মানুষ অন্য প্রতিষ্ঠানে তার চাকরির পেছনে ব্যয় করে তার অর্ধেক সময়ও ব্যক্তিগত উদ্যোগের ব্যপারে চিন্তা করতে পারে না। ফলে একই নিয়ম একই কাজ যুগের পর যুগ ধরে করে আসাকে সফলতা বলে ধরে আসছে। আর বর্তমানের সবচেয়ে সফলতম ক্যারিয়ার ধরে নেয়া হচ্ছে সরকারি চাকরি আরো নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে বিসিএস। মেয়েদের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময় বিয়েটাই প্রাধান্য পায় সমাজে। কর্মজীবী নারীদের সামনে কাজ সামলে ঘর সামলানো অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। সমাজ ব্যবস্থা এখনো সেই পর্যায় থেকে বের হতে পারেনি যেখানে নারীরা বাহিরে কাজ করবে।

লেখাপড়া শেষ করার পূর্বেই প্রতিনিয়ত শিখছি চাকরি ‘ প্রয়োজন’।যদি প্রয়োজনীয়তার মানেই পরিবর্তন হয়ে যায় তাহলে সমাজের পরিবর্তন তো সম্ভব নয়।একটা সময় ওকালতি পেশা বা উকিল হওয়াটা ছিল সফলতা

এরপর এল ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়া, আর এখন সফলতার সংজ্ঞা পাল্টে দাঁড়ালো বিসিএস ক্যাডার। এর মানে কি দাঁড়ালো, জীবনের ৩০টা বছর ধরে যাবর কাটতে হবে মুখস্থ করা বিষয় গুলো। একটা মানুষ বাঁচে কয় বছর?

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী জিল্লুর রহমানের মতে, “বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থার মূল সমস্যা এখন ধরতে গেলে আত্মনির্ভরশীলতার অভাব। সমাজ আত্মনির্ভরশীল হতে চাওয়া যুবকদের সহজে উৎসাহ দিতে চায় না। আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা অনেক আগে থেকেই আত্মনির্ভরশীল নাগরিক গড়ে তোলার ব্যবস্থার কথা বললেও আমাদের মাঝে সে বোধ এখনো তৈরি হয় নি। কারণ অনিশ্চিত জীবিকা নির্বাহের দিকে যাওয়ার জন্য কোন পরিবার অনুমতি দেয় না। আর তাই আক্ষরিক অর্থে শিক্ষার হার বাড়লেও বাস্তবে শিক্ষিত সমাজ গড়ে ওঠে নি এখনো।”

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আফরিন বলেন, ” আমি আপনি আর দশজন মিলেই সমাজ। বর্তমানে সমাজের অবস্থা এমন কারো একটু ভালো অবস্থান সৃষ্টি হলে আমরা হতাশ হয়ে পড়ি। এ সমস্যা গুলো আমরা নিজেরাই সৃষ্টি করি। সকল মানুষ এক নয়, সকলের চিন্তা, ধ্যান-ধারণাও এক নয়। অন্যের দোষ ত্রুটি খুঁজে বের করার চেয়ে ভালো নিজের ভালো গুণ গুলো বিকশিত করা।”

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী নুসরাত আলম বলেন, “বর্তমানে সমাজে বাবা-মায়ের মধ্যে একটা প্রবণতা হলো সন্তানদের পাশের বাসার সন্তানদের সাথে তুলনা করা। এর ফলে তাদের উপর একধরনের মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়। যার ফলাফল হয় খুব খারাপ।”

ভার্চুয়াল জগতে সকলে এত বেশি নিমগ্ন যে পরিবারের প্রতি সময় দেওয়া কমে যাচ্ছে। পরিবারের সকলে বসে একসাথে গল্প করা এই নিয়ম যেন উঠে গেছে। যার ফলে বাড়ছে অভিযোগের বোঝা। সৃজনশীল পদ্ধতির শিক্ষা ব্যবস্থা আসলেও সৃজনশীল মনোভাব হারিয়ে গেছে।

এখন যুব সমাজকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। মেধাবী শিক্ষার্থীগুলোকে ধরে রাখতে হবে দেশেই। যেদিন থেকে দেশকে স্বনির্ভর করার জন্য দেশে উৎপাদিত, উদ্ভাবিত বস্তু এবং প্রযুক্তিতে নির্ভরের উপর জোর দেয়া সম্ভব হবে সেদিন থেকে ৩০ বছর বয়সের পর থেকে নতুন কিছু ভাবার বদলে ৩০ এর আগেই প্রত্যেক যুবকের কিংবা যুবগোষ্ঠীর নিজস্ব কিছু সাথে থাকবে নিজের বলে গর্ব করার মত। আর সেদিন থেকে গ্লোব বায়োটেকের মত প্রতিষ্ঠানগুলোর চেষ্টাকে অবমূল্যায়ন করা হবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error

নিউজ টি শেয়ার করুন :)

Instagram
LinkedIn
Share
Follow by Email