পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসে ইরানের ওপর আবারও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা

ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি বাতিল করলেন যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ ঘোষণা দেন। পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসে ইরানের ওপর আবারও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

এ ধরনের চুক্তি কখনোই করা উচিত হয়নি উল্লেখ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ইরানের সাথে যে পরমাণু চুক্তি করা হয়েছে সেটি বজায় থাকলে দেশটি পারমাণবিক শক্তি অর্জন করবে। ইরান সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন দিচ্ছে। লেবাননের হেজবোল্লা, ফিলিস্তিনের হামাস এবং আল-কায়েদাকে ইরান সমর্থন দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন ট্রাম্প।

তার এই সিদ্ধান্তে ক্ষোভ জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় মিত্ররা বলেছে, তাদের জন্য এটা ‘দুঃখজনক’। এই খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করে চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী অন্য পক্ষগুলোকে তা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে পরমাণু কর্মসূচির কথা বলে তেহরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি করছে বলে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল পশ্চিমাদের। বিষয়টি নিয়ে কয়েক বছরের উত্তেজনার সমাপ্তি ঘটে ২০১৫ সালে এই চুক্তির মাধ্যমে।

২০১৫ সালে পৃথিবীর বৃহৎ শক্তিগুলো- যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন, রাশিয়া এবং জার্মানি পারমাণবিক চুক্তি করেছিল ইরানের সাথে। বারাক ওবামা যখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন সে সময় ইরানের সাথে পৃথিবীর বৃহৎ শক্তিগুলো পরমানু চুক্তি করেছিল।

সে চুক্তির মুল বিষয় ছিল, ইরান পরমাণু কার্যক্রম বন্ধ রাখবে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি কমিশন ইরানের যে কোন পরমাণু স্থাপনায় যে কোন সময় পরিদর্শন করতে পারবে। অর্থাৎ ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে সেজন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইরানকে নজরদারীর মধ্যে রাখতে পারবে। এর বিনিময়ে ইরানের উপর থেকে অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার পক্ষ থেকে আবার নতুন করে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেছেন ইরানের উপর।

বিষয়টি নিয়ে আলোচনার মধ্যে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে এই চুক্তিতে অবিচল থাকতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অনুরোধ করেছিলেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো। তার কথায় কাজ না হওয়ায় শেষ মুহূর্তে ওয়াশিংটনে ছুটে যান যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন। যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ী পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেস টিলারসনও এই চুক্তি টিকিয়ে রাখার পক্ষে ছিলেন বলে খবর দিয়েছিল মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন।

বারাক ওবামার আমলে করা ওই চুক্তি ‘ক্ষয়ে ও পঁচে গেছে’ মন্তব্য করে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে এটা তার জন্য ‘লজ্জাজনক’। এটা ভয়াবহ একপাক্ষিক চুক্তি, যা কখনও হওয়া উচিত হয়নি।

তার দাবি, ওই চুক্তিতে ইরানের ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, ২০২৫ সালের পর তাদের পরমাণু কর্মসূচি বা ইয়েমেন ও সিরিয়া যুদ্ধ নিয়ে তাদের ভূমিকার মতো বিষয়গুলো উঠে আসেনি।

ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে নতুন চুক্তির জন্য সমঝোতায় আগ্রহী তিনি। তবে তার এই ঘোষণাকে অবৈধ আখ্যায়িত করে তেহরান বলেছে, এভাবে চুক্তি থেকে সরে আসা আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রতি অবমাননা এবং তা অগ্রহণযোগ্য।

ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করল যে, নিজের অঙ্গীকারের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা নেই।” ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি পুনরায় শুরু করার নির্দেশ দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

ট্রাম্পের ঘোষণার পর এক যৌথ বিবৃতিতে ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য বলেছে, তারা এই চুক্তির প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ। ইরানকে শান্ত থাকারও আহ্বান জানিয়েছেন তিন দেশের নেতারা।

ইরানের উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান এখনো ইরানের সাথে ব্যবসা করছে তাদের ছয়মাস সময় দেয়া হয়েছে যাতে তারা সেসব ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে। সেটি না করলে কঠোর ‘পরিণতি ভোগ’ করতে হবে বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সতর্ক করে দেন। কোন দেশ যদি ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টাকে সহায়তা করে তাহলে আমেরিকা তাদের উপরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে বলে হুমকী দিয়েছেন ট্রাম্প। বিবিসি বাংলা

তবে এই সিদ্ধান্তের জন্য ট্রাম্পকে সাধুবাদ জানিয়েছে সৌদি আরব ও ইসরায়েল।ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘বিপর্যয়কর’ একটি চুক্তি থেকে ‘বলিষ্ঠভাবে’ সরে আসার এই সিদ্ধান্তকে ‘পূর্ণ সমর্থন’ করছেন তিনি।

জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি বলেছেন, সম্পূর্ণ সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তার প্রেসিডেন্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error

নিউজ টি শেয়ার করুন :)

Instagram
LinkedIn
Share
Follow by Email