অভিনব কৌশলে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি প্রতারকচক্র

রাজু চৌধুরী :

বাংলাদেশে কিছু প্রতারকচক্র নিত্যনতুন অভিনব কৌশলে মানুষের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, সম্প্রতি বিকাশ একাঊন্ট থেকে বিভিন্ন কৌশলে প্রতারনার আশ্রয় নিয়ে মানুষের টাকা নিয়ে যাচ্ছে একটি চক্র।এই প্রতারক চক্রের  প্রতারনার শিকার হয়ে টাকা হারিয়েছেন এমন লোকের সংখ্যা কম নয়।সব খবর হয়তো প্রকাশ হয়না কিংবা পুলিশ প্রশাসন জানতে পারে না।

গত ১৫/১১/২০১৭ইং দুপুরবেলা ০১৮২০১২৬৭২৮ নাম্বার থেকে  ফোন কল আসে আমার কাছে এবং জানতে চায় যে ,”আমার বিকাশ একাউন্টে কিছু টাকা ক্যাশ ইন হয়েছে কিনা? আমি বললাম কোন ম্যাসেজ তো আসেনি তখন সে বলে আমি একটা বিকাশ এজেন্টের দোকানে চাকুরি করি,একজন মহিলা কাস্টমার এর টাকা অন্য নাম্বারে পাঠানোর সময় ভুল করে আপনার নাম্বারে পাঠিয়ে দিয়েছি তখন আমি বলি আমার মোবাইলে তো কোন ম্যাসেজ আসেনি তখন সেই লোক বলে “আপানার একাউন্টে কত টাকা আগে ছিল তা ভালো করে চেক করে একটু দেখুন তো! যদি আপনার টাকার সাথে ১০০০ টাকা যোগ হয়ে থাকে তবে দয়া করে আমাকে আমার পাঠানো ১০০০ টাকা  ০১৮৩৯৩০৯৬৫৩ নাম্বারে ফেরত দিলে উপকার হব নাহলে মালিক আমার বেতন থেকে কেটে নেবে”।

“ভিন্ন নাম্বারে কেন টাকা দিব? জানতে চাইলে সেই লোক বলে “আমার ০১৮২০১২৬৭২৮ এই নাম্বারে টাকা ক্যাশ ইন হয়না”।

কথা বলার অল্প কিছুক্ষন পর আবার ফোন করে জানতে চায় আমি আমার বিকাশ একাউন্ট চেক করে দেখেছি কিনা? আরো জানতে চায় আমার কতছিল তা দেখলে বুঝতে পারব এই ভাবে বার বার ফোন কলের যন্ত্রনা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য একসময় বলেই বসলাম যে ভাই আমার একাউন্টে ১০৩১ টাকা আগেও ছিল এখনো তাই আছে নতুনভাবে কোন টাকা জমা হয়নি এই কথা বলার কিছুক্ষনের মধ্যে একটা ম্যাসেজ আসে ০১৮২০১২৬৭২৮ এই নাম্বার থেকে “ক্যাশ ইন টাকা ১০০০ ফ্রম ০১৮২০১২৬৭২৮ সাক্সেসফুল.ফি টাকা ০০.০.ব্যালেন্স টাকা ২,০৩১.৮২ TrxID 45g1t514128 at 15/11/2017 06:26”(মেসেজটি ইংরেজীতে ছিল)।

“ক্যাশ ইন ১০০০ টাকা সহ সর্বমোট ব্যালেন্স ২,০৩১ টাকা” এই মেসেজ আসার কিছুক্ষনের মধ্যেই আবার ফোন আসে এবং প্রশ্ন করে টাকা ক্যাশ ইন হয়েছে কিনা? হয়ে থাকলে ৫ টাকা চার্জটা কেটে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করে বার বার,

সে বলে “গরীবের টাকা রেখে তো আপনার লাভ নেই” এই সমস্ত কথা বলতে থাকে আর বলে আপনার বিশ্বাস না হলে যে কাস্টমার এর টাকা পাঠিয়েছি তার সাথে কথা বলেন  এই বলে মোবাইলটি অন্যজনকে কথা বলতে দেয় তখন একজন মহিলা বলে উঠে “ভাই আমি ১০০০ টাকা বিকাশে পাঠাতে এসেছি এই ছেলেটা ভুলে আপনার নাম্বারে পাঠিয়ে দিয়েছে এখন আপনি যদি টাকাটা না পাঠান তাহলে তো বেচারা বিপদে পড়ে যাবে। “গরীব মানুষের ছেলে দয়া করেন” না হলে ১০০০ টাকা বেতন থেকে ওর মালিক টাকা কেটে ফেলবে”

এই কথা শুনে তখন আমার মন একটু নরম হয়ে গেল, ম্যাসেজে ১০০০ টাকা ক্যাশ ইন হতে দেখে আমার বিকাশ একাউন্টের মূল ব্যালেন্স চেক করা ছাড়াই ৯৯৫ টাকা পাঠিয়ে দিলাম। পরে যখন আমার কাছে বিকাশের ম্যাসেজ আসল তখন দেখলাম আমার বর্তমান মূল ব্যালেন্স শুধুমাত্র ৩১ টাকা ।আমি কিছু বুঝতে পারছিলাম না কি করে ২০৩১ টাকা থেকে ব্যালেন্স শুধুমাত্র ৩১ টাকা তে চলে আসল? সমীকরণটি আমার কাছে কোনভাবেই পরিষ্কার হচ্ছিল না।

সাথে সাথে দৌঁড়ে গেলাম কাছাকাছি একটা বিকাশ এজেন্টের দোকানে এই বিষয়ে ধারনা নিতে এবং বিকাশ কাস্টমার কেয়ারএ ফোন করে জানাতে কিন্তু সেই দোকানের মালিকের সাথে আলাপ করে আসল রহস্য উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হলাম, ১০০০ টাকা বিকাশে ক্যাশ ইন এর যে ম্যাসেজটি আমার মোবাইলে এসেছে তা প্রকৃতপক্ষে বিকাশ কোম্পানী হতে প্রেরীত কোন ম্যাসেজ নয়,তা হলো প্রতারক চক্রের ব্যক্তিগত নাম্বার হতে পাঠানো ভূয়া ম্যাসেজ।

পরে জানতে পারলাম বিকাশ কোম্পানী থেকে পাঠানো ম্যাসেজে কোন নাম্বার প্রদর্শিত হয়না শুধুমাত্র ইংরেজীতে “বিকাশ “ শব্দটি লিখা থাকে। ধীরে ধীরে আমি বুঝতে পারলাম কিভাবে আমি সামান্য অসচেতনতার দরুন প্রতারিত হলাম। প্রতারকচক্র প্রশ্নের ফাঁকে কথার মারপ্যাঁচে আমার প্রকৃত ব্যালন্সটা জেনে নেয় এবং তার সাথে মিল রেখে ব্যক্তিগত মোবাইল থেকে ক্যাশ ইন এর ম্যাসেজ পাঠায় এবং আমি তাদের চালাকি ধরতে পারিনি।

আমার প্রকৃত যে টাকা জমা ছিল তার থেকেই ৯৯৫ টাকা পাঠিয়ে দিয়েছি নিজেরই অজান্তেই। নিজের বোকামিটা বুঝতে পেরে প্রতারকের সাথে আরো কথা বলতে আগ্রহী হয়ে উঠি কারন ততক্ষনে আমার ভিতর পেশাগত দায়িত্ববোধ এসে গেছে যে, “ প্রতারকচক্র আর কি কি করতে পারে জানা এবং একটা নিউজ করে জনসাধারনকে সতর্ক করা”।

সেই জন্যই ০১৮২০১২৬৭২৮ নাম্বারে আবার ফোন করি নরম সুরে বলি “ভাই আমিও একজন গরিব মানুষ আমার টাকাটা খেয়ে তোমার কোন লাভহবে না, টাকাটা আমার ভীষন জরুরী প্রয়োজন, আমার টাকাটা ফেরত দাও” তখন সে জানায় পরে আবার ফোন দিচ্ছি বলে লাইন কেটে দেওয়ার কিছুক্ষন পর ০১৬৩৭৮৭৪৭০১ এই নাম্বার থেকে ফোন করে বলে।“ আমি বিকাশ কাস্টমার কেয়ার থেকে বলছি” একটা অভিযোগ করা হয়েছে আপনার টাকা চলেগেছে চিন্তা করবেন না আমরা একটা “কোড নাম্বার” দিব তা কোন বিকাশ এজেন্টের দোকানে দিলে ওরা রিকোয়েষ্ট পাঠালেই টাকা জমা হয়ে যাবে।“

আরো দশ মিনিট পরে ০১৮৫৮২৪৭০৩১ এই নাম্বার থেকে ফোন করে আমাকে হুমকি দিতে থাকে যে “টাকা যা গেছে গেছে বেশি বাড়াবাড়ি করলে সমস্যা হবে”।এই ব্যাপারটা চট্টগ্রাম কোতোয়ালী থানাকে অবহিত করে একটা জি,ডি লিপিবদ্ধ করেছি।

“কোতোয়ালী থানার জি,ডি নাম্বার-১০৯৫ ১৬/১১/২০১৭ ইং” কোতোয়ালী থানায় জি,ডি করে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের নিকট সহযোগিতা কামনা করেছি এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সবধরনের সাহায্য-সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন।

এই ভাবে প্রতারনার শিকার হলেও একটা অভিজ্ঞতা হল এবং সাধারন মানুষদের সতর্ক করার জন্য এই বিষয়ে অনুসন্ধানী রিপোর্ট করতে আগ্রহী হয়ে পড়েছি এবং এখানে ১০০০ টাকা বড় বিষয় নয় জনসাধারনকে সতর্ক ও সচেতন করে দেওয়ার লক্ষে এবং প্রশাসন যেন প্রতারকচক্রটি আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তি দিতে পারে সেই জন্যই এই বিষয়ে রিপোর্ট লিখা।

এইভাবে প্রতিনিয়ত কত মানুষ যে স্বর্বশান্ত হচ্ছে তার কোন হিসাব নেই।নিত্য নতুন কায়দায় প্রতারকচক্র লোকদের ফাঁদে ফেলে ঠকিয়ে চলেছে আর সাধারন মানুষ এইসব প্রতারকদের কাছে অসহায়।

ফোন মধ্যমে যে কথাবার্তা হয় প্রকৃতপক্ষে এই প্রশ্নের মধ্যেই রয়েছে আসল রহস্য, যাহা সাধারন মানুষ বা সহজ সরল মানুষ তাদের ধূর্ততা বুঝতে পারেন না।“কথাবার্তার মাধ্যমে সে জেনে নেয় আপনার একাউন্টে বর্তমানে কত টাকা রয়েছে তখন সেই প্রতারক আপনার জমা টাকার সাথে মিল রেখে একটা ক্যাশ ইন এর ম্যাসেজ পাঠায়” যারা ভুল করে পুনরায় নিজের একাউন্টের ব্যালেন্স চেক করেন না,ম্যাসেজটা বিকাশ অফিস থেকে এসেছে মনেকরে, অন্যের টাকা ক্যাশ ইন হয়েছে মনে করে ভদ্রতা বশত টাকা রি-সেন্ড করে দেন তারাই পড়েন এই প্রতারকের ফাঁদে তখন তার একাউন্টের জমা টাকা চলে যায়, আর এইভাবে প্রতারনার শিকার হয়ে বিকাশ কাস্টমার কেয়ার এ অভিযোগ করেও কোন লাভ হবেনা, কারন এই লেনদেনটি তাদের মাধ্যমে নয়, এইটা সম্পূর্ণ নিজের কিছুটা বোকামি আর প্রতারকদের কথার ফাঁদে পড়ে ব্যাপারটি ঘটে থাকে। তাই কোন অভিযোগ করলেও বিকাশ এর পক্ষ থেকে কোন প্রকার সাহায্য করার উপায় থাকে না।

বিভিন্ন বিকাশ এজেন্টদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, প্রতিনিয়ত এমন প্রতারনার শিকার হয়ে অনেকেই অভিযোগ নিয়ে আসেন আবার অনেকেই কিভাবে প্রতারিত হয়েছেন তা বর্ননা করে কিভাবে সাহায্য পাবেন তা জানতে চান।প্রকৃতপক্ষে এই ধরনের প্রতারনা গুলো বিকাশ কোম্পানীর অগোচরে হয়ে থাকে।হয়তো দেখা যায় বিকাশ কোম্পানী এই বিষয়ে অবগত নয় এবং মাঝে মাঝে তারা সতর্কীকরন বার্তাও প্রচার করে থাকে গ্রাহকদের উদ্দ্যেশে।প্রতারকদের বিভিন্ন কৌশলের কাছে মানুষ, বিশেষ করে সহজ সরল মানূষ প্রতারনার ফাঁদে পড়ে।প্রতারকদের মিষ্টি কথায় যাদের মন একটু দূর্বল কিংবা নরম প্রকৃতির তাঁরা প্রতারকদের কথা মতো বিকাশে লেনদেন করে থাকেন।

কিছু ভুক্তভোগি অসহায় মানুষের মুখে শোনা বর্ননা থেকে বলছি ,এক ব্যক্তি বলেন হঠাৎ একজন লোক ফোন করে বলেন যে “তিনি বিকাশ অফিস থেকে বলছেন, বিকাশ একাউন্ট হোল্ডারদের তথ্য আপডেট করা হচ্ছে তাই কিছু ইনফরমেশন দিতে হবে” ভদ্রলোক কিছু উলটো প্রশ্ন করাতে ফোনের লাইন কেটে দেওয়া হয়।এইভাবে প্রতারনায় ব্যব্হৃত মোবাইল নাম্বার গুলোর ব্যাপারে প্রশাসনকে উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে রেজিঃষ্ট্রেশন করে মোবাইলের সীম সংগ্রহ ব্যবহার করা আইনী বাধ্যতামূলক। এর পরও মোবাইল নাম্বার ব্যবহার করে নিত্যনতুন কৌশলে কিভাবে প্রতারনা করতে পারে ? তা খুবই চিন্তার বিষয়।

সাধারন জনগন সতর্ক থাকার জন্য প্রতারক চক্রের মোবাইল নাম্বার গুলো দেওয়া হল।

প্রতারক চক্রের ব্যবহৃত নাম্বারঃ 

(১) ০১৮২০১২৬৭২৮ (২) ০১৮৩৯৩০৯৬৫৩ (৩) ০১৮৫৮২৪৭০৩১ (৪) ০১৬৩৭৮৭৪৭০১

One thought on “অভিনব কৌশলে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি প্রতারকচক্র

  • May 8, 2018 at 11:09 AM
    Permalink

    Vai deri hoise same vabe amar taka nise

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error

নিউজ টি শেয়ার করুন :)

Instagram
LinkedIn
Share
Follow by Email